/

বিসিএস ক্যাডার হওয়ার জন্য কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হয় – রেজওয়ানুল ইসলাম

জব স্টাডি নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিতঃ ৩:০৫ অপরাহ্ণ | জুলাই ৩০, ২০১৬

৩৪তম বিসিএস-এ যারা চূড়ান্তভাবে সফল হয়েছেন, তাঁদের সফলতার গল্প নিয়েই আমাদের ধারাবাহিক এই আয়োজন। আজ ধারাবাহিকের ১ম পর্ব।  আমরা বিশ্বাস করি প্রত্যেক বিসিএস ক্যাডারের সফল হওয়ার পিছনে থাকে এক একটি সুন্দর ও সংগ্রামের গল্প। যে গল্পটি হয়ে উঠতে পারে নতুনদের জন্য প্রেরণার উস।
আজকের গল্পটি মো: রেজওয়ানুল ইসলামের। স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার। হয়ে উঠলেন সফল বিসিএস ক্যাডার। ছাত্র জীবনে উদাসীন এই বালক কিভাবে সফল ক্যাডার হলেন তার গল্পই চলুন শোনা যাক।

IMG_20160730_203926_041

জব স্টাডি টুয়েন্টিফোর: ৩৪তম বিসিএস-এ চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ায় আপনার অনুভূতি কী?
রেজওয়ানুল ইসলাম: সফলতা সব সময় আনন্দের। ৩৪তম বিসিএস-এ চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ায়  সফল হয়ে গেছি আসলে বিষয়টি এরকম না, তবে একটা স্টেজে চলে এসেছি। সেদিক থেকে বলবো অনুভূতিটা খুব আনন্দের। আসলে এ অনুভূতি বলে প্রকাশ করা যাবে না।

জব স্টাডি টুয়েন্টিফোর: আপনার সফল হওয়ার পিছনে কার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি?
রেজওয়ানুল ইসলাম: আমার এ অবস্থানে আসার পিছনে অনেকের অবদান ছিল। বিশেষ করে বাবা-মার  অবদান কোনভাবেই ভুলার মত না।  আমার বাড়ি  থেকে কলেজের দূরত্ব ছিল ৭ কিমি। ঐ সময় যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভালো ছিল না। যে কারণে প্রতিদিন নদী পার হয়ে আমাকে সাইকেলে যেতে হত । নৌকার মাঝি যিনি আমাকে নৌকা পার করে দিতেন, আমার সফলতার পিছনে তার অবদানও কিন্তু খাটো করে দেখার  সুযোগ নেই। একইভাবে আমার সকল শিক্ষক, পরিবারের সদস্যদের পরামর্শ ও সহযোগিতার সম্মিলিত ফলাফলই হচ্ছে আজকের এই সফলতা ।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে আমার মায়ের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। কারণ আমার মা আমাকে সবসময়ই  স্বপ্ন দেখাতেন। একদিনের কথা মনে পড়ে, মার সাথে বাসে রাজশাহীতে আপুর বাসায় বেড়াতে যাচ্ছিলাম। আমাদের বাসটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ আমাদের বাসটিকে থামিয়ে দেয়া হল। দেখলাম কয়েকটি বাস রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় গেট দিয়ে বের হচ্ছিল। তখন আমার মা আমাকে বলল- ‘দেখ ওরা কত সুন্দর পড়াশোনা করে, আজকে আমাদের গাড়ি দাড়িয়ে আছে আর ওদের গাড়ি যাচ্ছে।’ সেদিন মার কথাটা দারুণ ভালো লেগেছিল। মনে স্বপ্ন জেগেছিল। পরবর্তীতে ‘বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’-এ ভর্তি হলাম। অত:পর ৩৪তম বিসিএস ক্যাডার।

জব স্টাডি টুয়েন্টিফোর: আমরা যতটুকু জানি আপনি ছাত্রজীবনের প্রথম দিকে পড়াশোনায় উদাসীন ছিলেন। হঠাৎ  পড়াশোনায় ভালো করা শুরু করলেন। পরিবর্তনটা কিভাবে ঘটেছিল?
রেজওয়ানুল ইসলাম: আমি ক্লাস এইট পর্যন্ত খুব ভালো ছাত্র ছিলাম না। সত্য বলতে কী, আমি ক্লাস এইট পর্যন্ত নকল করেই লিখতাম !!! ( হা হা হা …)  জীবনে তেমন কোন লক্ষ্য ছিল না।  গ্রামে থেকে বড় হয়েছি তো, যে কারণে জীবনের লক্ষ্য স্থির করতে পারতাম না। জীবনে বড় হতে হবে এরকম ভাবনা মনে কখনই আসেনি। মনে হতো বাবার মত কোন একটা স্কুলে শিক্ষকতা করেই জীবনটা কাটিয়ে দিবো।  বলে রাখা ভালো, আমার বাবা একজন শিক্ষক ছিলেন। তবে আমি বাবার স্কুলে পড়তাম না।
আমার জীবনের পরিবর্তনটা শুরু হয় মূলত যখন আমি ক্লাস নাইনে বাবার স্কুলে ভর্তি হলাম। বাবার স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর মনে হলো- নকল করে লিখবো?  কোন শিক্ষক দেখে ফেলে যদি আব্বুকে গিয়ে বলে, তখন আব্বুর পেস্টিজ কী হবে? এই  ধারণা থেকে ভাবলাম- ‘না আর নকল করা যাবে না।’ আমি পড়াশোনা শুরু করলাম। সেটাই ছিল আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। এসএসসি, এইচএসসিতে ভালো ফলাফল করলাম। পরবর্তীতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। এভাবেই পরিবর্তনটা ঘটেছিলো।

জব স্টাডি টুয়েন্টিফোর:  আমরা যতটুকু জানি, আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার লক্ষ্যে বেশ দীর্ঘদিন পর্যন্ত বিসিএস প্রস্তুতি থেকে দূরে ছিলেন। যেহেতু লক্ষ্যটা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া।  হঠাৎ করে কিভাবে আপনি  বিসিএস প্রস্তুতি শুরু করেন?
রেজওয়ানুল ইসলাম: মাস্টার্স পর্যন্ত জানতাম আমি আসলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হচ্ছি।  বিভিন্ন জটিলতায় সেটি সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেই। তাতেও ব্যর্থ হই। সবসময় মনে প্রাণে লালন করতাম আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবো।  যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার দৌড়ে সফল হতে পারছিলাম না,  তখন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরো অন্যান্য চাকুরির ১৩টি ভাইভা পরীক্ষা দেই। শেষপর্যন্ত উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেই। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েও ছাত্র/ছাত্রী ছাড়া মনে শান্তি পাচ্ছিলাম না। তাই  নতুন করে বিসিএস নিয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকি। আমি হাল ছেড়ে না দিয়ে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করলাম। শেষতক বিসিএস ক্যাডার হিসেবে সফল হলাম। এখন যা মনে হয় কঠোর পরিশ্রম করলে ক্যাডার হওয়া খুব কঠিন কিছু না। তবে এটাও ঠিক, শুধু পড়াশোনা করলেই হবে না, সিস্টেমেটিক ওয়েতে এগোতে হবে।  একটা বিষয় কিন্তু সবার জন্য একই । সবাই পড়াশোনা করছে, সবাই কিন্তু ক্যাডার হতে পারছে না। আসলে ক্যাডার হওয়ার জন্য কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হয়।

জব স্টাডি টুয়েন্টিফোর:  বিসিএস-এ সফল হওয়ার জন্য মূলত কী ধরণের রুটিন ফলো করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
রেজওয়ানুল ইসলাম: আসলে পড়াটা হচ্ছে নিজের বিষয়। আমি কখন পড়বো, কোন সময় আমার ভালো লাগে, রুটিন সেভাবেই হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। কারণ কারোর উপর কোন রুটিন চাপিয়ে দিলে সেটি খুব বেশি ইফেক্টিভ হয় না। ধরুন আমার সকালবেলা পড়তে ভালো লাগে, তাহলে আমাকে সকাল বেলার সময়টাই বেছে নিতে হবে। আমার কাছে যে টপিকস্ সবচেয়ে কঠিন, সেটি আমাকে প্রথমে পড়তে হবে। তাহলে ঐ বিষয়টি দ্রুত ক্যাপচার সম্ভব হবে। আরেকটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার, সেটি হচ্ছে কোন বইয়ের যে পেজগুলো আপনি পড়বেন ঐ পেজগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করে টার্গেট নির্ধারণ করুন।  ধরুন আপনি একটা বিষয়ে ১০ টা পেজ  পড়বেন। প্রথমত পেজগুলিকে ২টি ভাগে ভাগ করে তার জন্য সময় নির্ধারণ করুন। শুরুতে ৫ পেজ পড়ার টার্গেট নিন। ফলে আপনার কাছে  বিষয়টা হালকা মনে হবে। প্রথম ৫ পেজ পড়া শেষ হলে, আবার নতুন করে আরো ৫ পেজের টার্গেট নিন, দেখবেন কোন রকম চাপ ছাড়াই আপনি ১০ টি পেজ পড়ে শেষ করতে পেরেছেন।

জব স্টাডি টুয়েন্টিফোর:  আপনি জানেন যে, খুব শীঘ্রই ৩৭তম প্রিলি. টেস্ট অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষার হলে একজন ছাত্র-ছাত্রীকে কিভাবে টাইম ম্যানেজমেন্ট করা উচিত?
রেজওয়ানুল ইসলাম: পরীক্ষা চলাকালীন ‘সময়’ আসলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেকের ভালো প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও প্রিলিতে সময়ের অব্যবস্থাপনার কারণে প্রিলিতে উত্তীর্ণ হতে পারে না।  প্রিলির জন্য ২ ঘন্টা সময় বরাদ্দ থাকে। যে প্রশ্নগুলো সবচেয়ে ইজি,  একবার দেখলেই পারা সম্ভব সেই প্রশ্নগুলো দ্রুততার সাথে উত্তর করতে হবে।  সেক্ষেত্রে বাংলা / বিজ্ঞান / বাংলাদেশ-আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি হতে পারে। ৩০মিনিটে প্রায় ১০০ টি প্রশ্ন দাগানো সম্ভব। ইংরেজির যে প্রশ্নগুলো কমন পাওয়া যাবে সেগুলোও দাগিয়ে ফেলতে হবে। গণিতের জন্যও একটা নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ রাখুন। পাশাপাশি যে প্রশ্নগুলো কনফিউশনের সেগুলো বিশেষ চিহ্ন দিয়ে রাখুন, যাতে দ্বিতীয় দফায় ঐ প্রশ্নগুলোর উপর সহজেই চোখ বুলাতে পারেন। একটি বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে- কোনক্রমেই ভুল উত্তর করা যাবে না। মাথা ঠাণ্ডা রাখুন, সময়ের প্রতি সতর্ক থাকুন। এজন্য আপনি পরীক্ষার পূর্বে বাসায় বেশি বেশি মডেল দিয়ে নিজেকে তৈরি করুন।

জব স্টাডি টুয়েন্টিফোর: অল্পকথায় বিসিএস ক্যাডার প্রত্যাশিদের জন্য কিছু বলুন।
রেজওয়ানুল ইসলাম: নিয়মিত স্টাডি করুন। সময়ের সঠিক সদব্যবহার করুন। মুখস্ত না করে বুঝে বুঝে পড়ার চেষ্টা করুন। কমপক্ষে ১টি বাংলা ও ১টি ইংরেজি দৈনিক পড়ুন। নিজের উপর সবসময় আত্মবিশ্বাস রাখুন। সফলতা আসবেই ইনশাল্লাহ।

জব স্টাডি টুয়েন্টিফোর: ধন্যবাদ আপনাকে।
রেজওয়ানুল ইসলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সম্মানিত পাঠক, আপনি কী ৩৪তম বিসিএস-এ সফল ক্যাডারদের একজন? হ্যা, আপনি যদি ৩৪তম বিসিএস-এ সফল ক্যাডার হোন তাহলে আমরা আপনার সফলতার গল্প জানতে চাই, সবাইকে জানাতে চাই। হয়ত আপনার সফলতার গল্পই বদলে দিতে পারে হাজারো তরুণের স্বপ্ন। বদলে দিতে পারে প্রিয় বাংলাদেশকে। তাই চটজলদি লিখে ফেলুন আপনার ৩৪তম ক্যাডার হিসেবে সফল হওয়ার গল্প। পাঠিয়ে দিন: kabialnoor@gmail.com- ইমেইলে। ধন্যবাদ।