/

আন্তর্জাতিক জি–২০ সম্মেলন : কূটনৈতিক বিবাদের সম্মেলন

জব স্টাডি নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিতঃ ৮:৪৯ পূর্বাহ্ণ | সেপ্টেম্বর ০৭, ২০১৬

oabam-china-arrivalবিশ্বের সর্বাধিক দূষণকারী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র ও চীন গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর ব্যাপারে নতুন করে অঙ্গীকার করেছে। জাপানি প্রেসিডেন্ট শিনজো আবে ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের মধ্যকার একটি বৈঠক অকার্যকর হলে তাঁরা পরে আবারও বৈঠক করেন। তারপর তাঁরা হাসিমুখে ছবির জন্য পোজও দেন। কথা হচ্ছে, চীন অনেক কষ্ট করে এই সম্মেলন আয়োজন করলেও কূটনৈতিক বিবাদ ও অবাস্তবায়িত আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারটাই সম্মেলনে প্রধান হয়ে ওঠে।
চীন ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বরের এই সম্মেলনকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিল। তাদের আনুষ্ঠানিক মোটো ছিল এ রকম: ‘পরিবর্তনশীল, তেজস্বী, আন্তসম্পর্কিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিমুখে’। কিন্তু তা সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য চীনে আসার পর থেকেই সম্মেলনটি নানাভাবে বিতর্কিত হতে শুরু করে। বিপত্তি ঘটেছে ওবামার এয়ারফোর্স ওয়ান বিমান থেকে নামার তরিকা নিয়ে। সাধারণত, রাষ্ট্রপ্রধানেরা বিমানের উঁচু দরজা দিয়ে নামেন, তাঁদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অভ্যর্থনা জানানো হয়। কিন্তু ওবামা নিচের দিককার একটি সিঁড়ি দিয়ে বিমান থেকে নেমেছেন।

উভয় পক্ষই বলেছে, একজন ইংরেজি না–জানা চালক এয়ারফোর্স ওয়ানের দরজা পর্যন্ত সিঁড়ি নিয়ে যেতে পারেন কি না, এ নিয়ে বিতর্কের জেরে এটি ঘটেছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনিং বলেছেন, ‘চীনের সঙ্গে এসব ব্যাপারে প্রথমে যে বন্দোবস্ত হয়েছিল, মার্কিন দলটি যদি শুধু সেটা মানত, তাহলে এটা হয়তো ঘটত না।’

কিন্তু কথা হচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী বিমানে তো একটা সিঁড়িও থাকে, সেটা ব্যবহার করা হয়নি কেন, তা নিয়েও মতানৈক্য রয়েছে। সাধারণত মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিদেশ সফরে গেলে এই সিঁড়ি দিয়েই বিমান থেকে নামেন। এ প্রসঙ্গে
হুয়া বলেন, ‘দেখুন, সব রাষ্ট্রপ্রধানই কিন্তু চীনের দেওয়া সিঁড়ি ব্যবহার করে বিমান থেকে নেমেছেন, তাহলে শুধু মার্কিন প্রেসিডেন্ট এটা করবেন না কেন?’ তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক–বিষয়ক এক উপদেষ্টা বলেছেন, চীনা নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের অতি উৎসাহের কারণে এমনটি ঘটেছে। মার্কিন প্রমিত প্রটোকল মানলে অসুবিধা কী ছিল। তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় না বারাক ওবামাকে হেয় করার জন্য এ কাজ করা হয়েছে। তবে এর মধ্যে তেমন একটা উষ্ণতার ছোঁয়া ছিল না।’

ওদিকে বারাক ওবামা এই ঘটনাকে বেশি গুরুত্ব দিতে নারাজ। তিনি মার্কিন-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংক্ষেপে কিছু বাধা চিহ্নিত করেছেন: মানবাধিকার, চীনাদের বিরুদ্ধে সাইবার হ্যাকিংয়ের অভিযোগ ও বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগর। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি দুই দেশের সম্পর্কের এক আশাব্যঞ্জক চিত্র হাজির করেছেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কের স্থিতিশীল উন্নয়ন হয়েছে।’

কিন্তু শি জিন পিং দেশে ও দেশের বাইরের সব ব্যাপারেই দৃঢ় প্রত্যয় দেখাতে শুরু করার পর মার্কিন-চীন সম্পর্কের ‘স্থিতিশীল উন্নয়ন’ হয়েছে বলা যাবে না। শি চীনে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছেন, যেটা চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। তাঁর প্রশাসন তথাকথিত পশ্চিমা মূল্যবোধ, যেমন বাক্‌স্বাধীনতা ও জমায়েত হওয়ার অধিকারকে চীনের বিরুদ্ধে অনিষ্টকর চক্রান্ত হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। কথা হচ্ছে, চীনা রাষ্ট্র যেভাবে মার্কিনবিরোধী একঘেয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, তারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের যুগে চলে গেছে। তাদের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে না, তারা এখন একুশ শতকে আছে, যেখানে তারা বিশ্বায়িত অর্থনীতির একটি অংশ, যারা পশ্চিমের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অর্থবাজার—কোনো ক্ষেত্রেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একমত হতে পারছে না। তবে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হচ্ছে, তারা জলবায়ু পরিবর্তনের রাশ টেনে ধরতে প্যারিস চুক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

ওবামা ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ চুক্তি করার আশা নিয়ে চীনে এসেছিলেন, তাঁর দেশেই যার বিরোধিতা হয়েছে। এই চুক্তিতে ১২টি দেশ রয়েছে, যদিও একটি দেশ লক্ষণীয়ভাবে এতে ছিল না—চীন। কিন্তু এই মুক্তবাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে মার্কিন কংগ্রেস তীব্র বিরোধিতা করেছে। এমনকি হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পও যে এই চুক্তির বিরুদ্ধে, সেই সংকেত তারা দিয়েছে। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য এটাই ছিল ওবামার অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রাণভোমরা। কিন্তু এখন এটা নিয়ে তিনি বেশি দূর যেতে পারবেন না। অন্যদিকে চীন বিশ্ব অর্থবাজারে নিজের অবস্থান জোরালো করার যে চেষ্টা করছিল, এই সম্মেলনের আগে কানাডা চীনা নেতৃত্বাধীন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকে সদস্যপদ পাওয়ার আবেদন করে তার পালে হাওয়া দিয়েছে। কথা হচ্ছে, বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান এতে যোগ দেয়নি।

অন্যদিকে জি-২০ সম্মেলনের শেষের দিকে উত্তর কোরিয়া জাপান সাগরের দিকে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। বেইজিং আবার এই সম্মেলনে দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন-সমর্থিত থাড ক্ষেপণাস্ত্রবিধ্বংসী ব্যবস্থা স্থাপনের বিরোধিতা করেছে। কিন্তু সিউল বলেছে, উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে তার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। কিন্তু এই ক্ষেপণাস্ত্রের ঘটনা চীনের জন্য একেবারেই উদ্বেগের বিষয় নয়। ওদিকে ৫ সেপ্টেম্বর হংকংয়ের নির্বাচনের ফলাফল আসতে শুরু করে। সেখানকার মানুষেরা চীন প্রভাবিত নীতির বিরুদ্ধে মত দিয়েছে। সোমবার বেলা শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হাংচৌতে এক পার্শ্ব বৈঠকে মিলিত হন। তবে সিরিয়ার মানবিক সংকট মোকাবিলা করার ব্যাপারে তাঁরা কিছু করতে পারেননি।

কথা হচ্ছে, জি-২০ সম্মেলন নিয়ে বেইজিং বেশ প্রচার-প্রচারণা চালালেও বিশ্বনেতারা সেখানে বড় কোনো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মতৈক্যে আসতে গলদঘর্ম হয়েছেন। প্যারিসের নামের সঙ্গে জলবায়ু চুক্তির নাম জড়িয়ে আছে। ব্যাপারটা ঠিক না বেঠিক, তা বলছি না, কিন্তু হাংচৌর নামের সঙ্গে বিমানের সিঁড়ির বিতর্ক জড়িয়ে যেতে পারে।

অনুবাদ‍: প্রতীক বর্ধন, টাইম ডটকম থেকে নেওয়া।

হানাহ্‌ বিচ: টাইম ম্যাগাজিনের পূর্ব এশিয়া ও চীন ব্যুরোপ্রধান।

বাংলা তথ্যসূত্র: দৈনিক প্রথম আলো।