/

ডোকলাম মালভূমি : চীন ও ভারতের চলমান দ্বন্দ্ব

জব স্টাডি নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিতঃ ১২:৫৫ অপরাহ্ণ | আগস্ট ৩০, ২০১৭

‘টপ অব দ্যা টাইম’ বিভাগে আমরা সবসময় চলমান বৈশ্বিক উত্তেজনা নিয়ে আলোকপাত করে থাকি। বর্তমান সময়ের টপ অব দ্যা টাইম হচ্ছে- ডোকলাম মালভূমি নিয়ে চীন ও ভারতের দ্বন্দ্ব। যা বিসিএস লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ । 

 

১৬ জুন, ২০১৭ এশিয়ার দুই শক্তিশালী রাষ্ট্রের মাঝে ডোকলাম তরাই এলাকা নিয়ে শুরু হওয়া চরম উত্তেজনা এখন ক্রমশ কমছে।  ভারত-ভুটান-চীনের সীমানায় ত্রিভূজাকৃতি বিন্দুতে অবস্থিত ডোকলাম তরাই এলাকা। ভুটান একে বলে ‘ডোকলাম’, ভারতে বলে ‘ডোকা’ লা’ আর চীন বলে ‘ডংল্যাং’।

 

উত্তেজনার পেক্ষাপট 

চীনা সেনাবাহিনীর  এক দল  শ্রমিক  ডোকলাম গিরিপথে সড়ক তৈরি শুরু করলে ভুটান সরকারিভাবে এর প্রতিবাদ জানায়। এরপর ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৯ জুন ২০১৭ ঘটনাস্থলে গিয়ে রাস্তা তৈরির কাজ আটকে দিলে মুখোমুখি অবস্থান নেয় দু’দেশের সামরিক বাহিনী। ফলে দু দেশের মাঝে তৈরি হয় যুদ্ধাবস্থা। এমন উত্তেজনার মাঝেই চীন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীন এর অংশ হিসাবে ডোকলাম চিত্রায়িত একটি মানচিত্র প্রকাশ করে।মানচিত্র দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহার করে চীনের স্পোকসর লু কং ১৮৯০ সালের কলকাতার সম্মেলন অধ্যায়-১ এ বলেছিলেন এবং এটি প্রমাণ করেছে যে, ডগলল্যান্ড (ডক্লিম) এলাকাটি, গুপমোচির একটি উত্তর-পূর্বাঞ্চল, যা মানচিত্রে প্রদর্শন করে চীন।

ভারতের বক্তব্য, ডোকা লা উপত্যকা থেকে ‘শিলিগুড়ি করিডরের’ দূরত্ব বেশি নয়। এখান থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে সহজেই পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। এখানে সড়ক গড়ার নাম করে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করতে চায় বেইজিং। এজন্য ভারতকে নিশানা বানাতে চায় দেশটি।

মূলত ‘শিলিগুড়ি করিডর’ দিয়ে ভারত তার উত্তর-পূর্ব  রাজ্যগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে । তাছাড়া  ভারত এই করিডরের মাধ্যমে চীনের যেকোন আগ্রাসনের মোকাবেলা করতে পারে। এই  বাস্তবতাটুকু চীন বুঝতে পেরেছে বলেই ডোকলাম অঞ্চলে তাদের সরব উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়।

আনিস আলমগীর এর মতে, ডোকলাম গিরিপথের শেষ প্রান্ত থেকে ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর খুবই নিকটবর্তী। কোনও কারণে ডোকলাম গিরিপথ চীনের দখলে চলে গেলে শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। শিলিগুড়ি করিডোর বন্ধ হয়ে গেলে ভারতের পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্য মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। সুতরাং ভারত সহজে ডোকলাম গিরিপথ নিয়ে চীনের সঙ্গে এ গিরিপথের অধিকার ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে কোনও সমঝোতা করতে পারে না। ভুটানকেও কোনও সমঝোতা করতে দেবে না। ভুটান সম্ভবত চীনের সঙ্গে এখনই একটা সমঝোতায় পৌঁছতে রাজি বলে মনে হয়।

ডোকলাম সীমান্ত নিয়ে দ্বন্দ্বটি নতুন নয়। এর পূর্বে ও  ১৯৬২ সালের ডোকা লা সীমান্তেই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে ভারত পরাজিত হয়। যুদ্ধের পর থেকেই দুই দেশের নিরাপত্তা বাহিনী দুই পাশে নিয়মিত টহল দিয়ে আসছে। দুর্গম এ অঞ্চলে রয়েছে দুই দেশের অস্থায়ী ক্যাম্পও।

 

পক্ষ-বিপক্ষ 

ভারত ও চীন। তবে ভারতের পাশে রয়েছে ভুটান।  ভুটানের সঙ্গে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই বললেই চলে। ফলে থিম্পুকে পাশে পেয়েছে দিল্লি।

 

 মিডিয়ায় ‘ভারত-চীন দ্বন্দ্ব’ 

চীন-ভারত দ্বন্দ্ব ও বিশ্ব রাজনীতিতে এর প্রভাব- তারেক শামসুর রেহমান ( যুগান্তর) 

ডোকলাম নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সেখানে একটি যুদ্ধের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে লাদাখে দু’পক্ষের মাঝে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।

গত দু’মাস ধরে ভারতীয় ও চীনা সেনারা সেখানে পরস্পর মুখোমুখি অবস্থানে আছে। সর্বশেষ ঘটনায় ভারত তার পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে আরও সৈন্য পাঠিয়েছে।

শুধু তাই নয়, ডোকলামের কাছাকাছি একটি গ্রামের (নাথাং) বাসিন্দাদের তাদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ভারতীয় সেনা কর্তৃপক্ষ।

এ গ্রামটি ডোকলাম (চীনারা বলে দং লাং) থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরে। সিকিম ও অরুণাচলে মোতায়েন করা ভারতীয় সেনাবাহিনীকেও সেখানে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে একজন চীনা কমান্ডার কর্নেল লিলি বেইজিংয়ের হুয়াইবোউ সেনা ছাউনিতে আয়োজিত এক কর্মসূচিতে ভারতীয় সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ডোকলাম থেকে ভারতীয় সেনা সরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি এ কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, প্রয়োজন হলে চীন উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আর চীন সরকারের মুখপাত্র হিসেবে বিবেচিত ‘গ্লোবাল টাইমস’ মন্তব্য করেছে ডোকলাম থেকে ভারতীয় সেনা হটাতে প্রয়োজনে সামরিক অভিযান চালাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত চীন। যে কোনো মুহূর্তে চীন এ অপারেশন চালাতে পারে বলেও মন্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে ডোকলাম নিয়ে বড় ধরনের উত্তেজনা রয়েছে। এ উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত ১৯৬২ সালের মতো দ্বিতীয় চীন-ভারত যুদ্ধের জন্ম দেবে কিনা, তা এ মুহূর্তে বলা মুশকিল।

তবে এশিয়ার দুই বড় শক্তি, চীন ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে যে ঐক্যের জন্ম হয়েছিল, ডোকলামের ঘটনায় তা যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্পষ্টতই এই দেশ দুটির মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতার জন্ম হয়েছে, যা ব্রিকসের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কিছুটা হলেও এর প্রভাব পড়েছে। ডোকলাম ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য পশ্চিমা শক্তিগুলো ভারতের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বড় শক্তিও ভারতের পক্ষে।

এ ক্ষেত্রে চীন চেষ্টা করছে ভুটান ও নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে। বিশেষ করে ডোকলাম থেকে ভারত যাতে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়, সে ব্যাপারে ভুটানকে রাজি করাতে চেষ্টা করছে চীন।

বলা ভালো, ডোকলাম নিয়ে সমস্যা মূলত ভুটান ও চীনের। ভারত সেখানে সৈন্য পাঠিয়েছে ভুটানের অনুরোধে। ভুটান-ভারত মৈত্রী চুক্তি বলে ভারত সেখানে সৈন্য পাঠিয়েছে। ডোকলামে চীন সড়ক নির্মাণ করছে।

ভারতের ভয় এখানেই। কৌশলগতভাবে ভারতের জন্য এলাকাটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এই এলাকার জম্পলরি (জামফেরি) পর্বত-শিরা থেকে শিলিগুড়ি করিডোর হাতের তালুর মতো দেখা যায়। চীন সেখানে তার স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চাইছে। ইতিমধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা বেইজিং সফর করেছেন; কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি।

চীন ও ভারত কেউই ডোকলাম থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়নি। চীন ও ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। বিশ্ব অর্থনীতি দেশ দুটোর অবদান আছে।

এখন দেশ দুটোর মধ্যে যদি উত্তেজনা অব্যাহত থাকে, তা একদিকে যেমনি চীনের জন্যও ভালো নয়, ঠিক তেমনি ভালো নয় ভারতের জন্যও। ব্রিকস মুখ থুবড়ে পড়বে। অথচ পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতির কারণে চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন ব্রিকসের গুরুত্ব বাড়ছে। চীন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তি। এ অঞ্চলের দেশগুলোর উন্নয়নে চীন একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচি থেকে ভারতও উপকৃত হতে পারে। যদিও ভারত এতে যোগ দেয়নি। তারপরও কথা থেকে যায়- ভারত এই বিশাল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে পারে না।

চীন বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি। ২০১০ সালে জিএনপির দিক থেকে জাপানকে ছাড়িয়ে যায় চীন। যেখানে ১৯৮০ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের অবদান ছিল মাত্র ২ দশমিক ২ ভাগ (যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ ভাগ), সেখানে বলা হচ্ছে ২০৫০ সালে ppp (Purchasing, Price, Parity)-এর  হিসাব অনুযায়ী  চীনের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে যাবে।

উৎপাদনশীল পণ্যের, বিশেষ করে ইকেট্রুনিক্স পণ্যের দিক থেকে চীন এখন এক মহাশক্তি। বিশ্বের যত ফটোকপিয়ার, মাইক্রোওয়েভ ও জুতা উৎপাদিত হয়, তার ৩ ভাগের ২ ভাগ চীন একা উৎপাদন করে। সেইসঙ্গে বিশ্বে উৎপাদিত মোবাইল ফোনের ৬০ ভাগ, ডিভিডির ৫৫ ভাগ, ডিজিটাল ক্যামেরার ৫০ ভাগ, পারসোনাল কম্পিউটারের ৩০ ভাগ, শিশুদের খেলনার ৭৫ ভাগ চীন একা উৎপাদন করে।

ফলে বিশ্বব্যাপী চীনা পণ্যের একটা বাজার তৈরি হয়েছে। চীনে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের ওপরে। ফরচুন ম্যাগাজিন বিশ্বের বড় ৫০০ কোম্পানির কথা উল্লেখ করেছে, সেখানে চীনের রয়েছে ৩৭টি কোম্পানি। বিশ্বে যত জ্বালানি ব্যবহৃত হয় তার মাঝে এককভাবে চীনে ব্যবহৃত হয় তার ১৬ ভাগ। আর বিশ্বে জ্বালানি তেলের ব্যবহারের দিক থেকে ৩ ভাগের ১ ভাগ ব্যবহার করে চীন।

যে কারণে চীনকে বিশ্বের অন্যতম পরিবেশ দূষণকারী দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরিবেশ দূষণের কারণে চীনে ক্যান্সারে মৃত্যুর হার বেড়েছে ২৯ ভাগ। চীনে রয়েছে বিশাল এক তরুণ প্রজন্ম, যারা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। প্রতিবছর ২১ মিলিয়ন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হয়। আর প্রতিবছর ৩ লাখ শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে যায়। তারা ফিরেও আসে। ১৯৪৮ সালে (স্বাধীনতার ঠিক এক বছর আগে) যেখানে চীনে শিক্ষিতের হার ছিল মাত্র ২০ ভাগ, এখন সেখানে ১০০ ভাগ শিক্ষিত।

অর্থনৈতিক সংস্কারের কারণে চীনে যে ব্যাপক অর্থনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, তাতে প্রায় ২০ কোটি মানুষকে চীন অতি দরিদ্রতম অবস্থা (প্রতিদিন জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত ১.২৫ ডলার আয় হিসাবে) থেকে বের করে এনে কিছুটা সচ্ছলতা দিয়েছে। যদিও বলা হয়, এখনও প্রায় ২০৭ মিলিয়ন লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেশটিতে একদিকে যেমনি ধনী ও গরিবের মধ্যে এক ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করেছে, ঠিক তেমনি বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যেও বৈষম্য তৈরি হয়েছে। মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসছে।

বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো এখন কর্মজীবী মানুষের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। মানুষের আয় সেখানে বেশি। হাজার হাজার টাউনশিপ এখন তৈরি হয়েছে, যা বদলে দিয়েছে চীনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জীবনযাত্রা। চীনকে নিয়ে খারাপ খবরও আছে। যেখানে ২০০৯ সালে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ ভাগ, ২০১২ সালে তা কমে এসে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৮ ভাগে।

বর্তমানে ৬ দশমিক ৯ ভাগ। মুদ্রাস্ফীতি ৩ দশমিক ৫ ভাগ। আর শহুরে বেকার সংখ্যা ৪-৬ ভাগের নিচে। এই যে চীন, এই চীনের নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্বটি এখন বর্তিয়েছে শি জিনপিংয়ের ঘাড়ে। কোন পথে এখন চীন? শি জিনপিংয়ের এজেন্ডায় রাশিয়া ও ভারতকে প্রাধান্য দিলেও এটা সত্য, আন্তর্জাতিক ইস্যুকে গুরুত্ব দিচ্ছে চীন।

বেশকিছু বিশ্লেষকের লেখা পড়ে যা মনে হয়েছে, তা হচ্ছে শি জিনপিং এখন প্রথমেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন তার ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচিকে। এক বিশাল দেশ চীন। প্রায় ৫৫ জাতি ও উপজাতি নিয়ে গড়ে উঠেছে দেশটি। ২২ প্রদেশ, ৫ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, ৪ বিশেষ অঞ্চল ও ১৪৭ বিশেষ এলাকা নিয়ে চীন রাষ্ট্র।

রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে সেই রাষ্ট্রটি ভেঙেও যেতে পারে। এ কারণেই চীনা নেতারা রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে সতর্ক থাকছেন। যে ভুল করেছিলেন গর্বাচেভ, সেই ভুল করেননি চীনা নেতারা। সেনাবাহিনী এখনও পার্টির প্রতি অনুগত। তাই অর্থনৈতিক সংস্কারকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। তবে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। ফুজিয়ান, ঝে ঝিয়াং কিংবা সাংহাই প্রদেশগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক সমৃদ্ধশালী।

চীন ও ভারত নিকট প্রতিবেশী দুটি দেশ। প্রভাব বলয় বিস্তারের রাজনীতিতে দেশ দুটির মাঝে এক ধরনের ‘দ্বন্দ্ব’ থাকলেও, পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতির কারণে ভারতের যেমনি প্রয়োজন রয়েছে চীনের সাহায্য ও সহযোগিতার; ঠিক তেমনি চীনেরও প্রয়োজন রয়েছে ভারতের সাহায্য ও সহযোগিতা। ব্রিকস ব্যাংক বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের কর্তৃত্ব ও প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এখন চীন ও ভারত যদি নিজেদের মাঝে বিরোধ অব্যাহত রাখে, তাহলে ব্রিকস ব্যাংক বিকশিত হবে না। ‘সিকিমকে স্বাধীন করার’ তথাকথিত চীনা বক্তব্য, তা-ও গ্রহণযোগ্য নয়। এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় হস্তক্ষেপের শামিল। চীন এটা করতে পারে না। সাধারণত চীন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় নাক গলায় না। এ ক্ষেত্রে সিকিম প্রশ্নে চীনা গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক বক্তব্য ভারতের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় হস্তক্ষেপের শামিল, যা নিন্দনীয়। একুশ শতকে আমরা চীনকে দেখব অন্যতম এক শক্তি হিসেবে।

বিশেষ করে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের উত্থান বিশ্বের সব অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে। ব্রিকস এ চীন ও ভারত অন্তর্ভুক্ত হলেও এশিয়ার এই দুই অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যকার দ্বন্দ্ব এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে একটি ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিতে পারে।

ভারতে জনগোষ্ঠীর ৩৭ দশমিক ০২ভাগ দরিদ্রতার মধ্যে বসবাস করলেও আগামী ২৫ বছরের মধ্যে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। তখন সাধারণ মানুষের মাথাপিছু আয় ৯৪০ ডলার থেকে বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ২২ হাজার ডলারে। ২০০৭ সালে যেখানে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত অবদান রাখত মাত্র ২ ভাগ, তখন অবদান রাখবে ১৭ ভাগ।

সুতরাং ভারতকে ফেলে দেয়া যাবে না। তাই কোনো কোনো বিশ্লেষক, (জনাথন হোলসলাগ, ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন) একসময় একটি সম্ভাব্য ‘chindia’ ধারণার কথা বলেছিলেন, যেখানে চীন ও ভারত একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এ ধারণা অমূলক নয়। সাম্প্রতিক সময়ে চীন-ভারত বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। চীনা নেতারা ভারত সফর করেছেন। সীমান্ত সমস্যা নিয়েও (অরুণাচল) এক ধরনের স্থিতাবস্থা বিরাজ করছে। ক্ষমতা গ্রহণ করে শি জিনপিং ভারতবিরোধী তেমন কোনো কথা বলেননি। তিনি ভারত সফরও করেছেন। সদ্যসমাপ্ত জি-২০ (হামর্বুগ) সম্মেলনে জিনপিং-মোদি সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে। যদিও সাক্ষাৎকারটি উষ্ণ ছিল না। কিন্তু সাক্ষাৎকারটি না হলেই বরং নানা প্রশ্নের জন্ম দিত। এমনকি সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ারও সম্ভাবনা ছিল।

চীন-ভারত সীমান্ত উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিত পরিস্থিতি এখন কোনো দিকে যায়, বলা মুশকিল। কিন্তু ১৯৬২ সালের মতো আরেকটি ‘যুদ্ধ’ হোক, এটা বোধকরি উভয় দেশের নেতারা কেউই চাইবেন না। আর্জিত দোভালের পাশাপাশি পররাষ্ট্র সচিব জয়শঙ্করও বেইজিং সফরের পর আগামী সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। মোদি তখন চীনে যাবেন। আসলে উভয় দেশেই কট্টরপন্থী কিছু লোক আছে, যারা দু’দেশের মাঝে উত্তেজনা বজায় রেখে সুবিধা নিতে চায়। এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এই মুহূর্তে ডোকলাম উপত্যকা থেকে উভয় দেশের সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়া জরুরি। এর বাইরে অন্য বিষয়গুলো আলোচনা না করাই মঙ্গল।

একদিকে অরুণাচল, অন্যদিকে কাশ্মীর- দুটো বিষয়ই খুব স্পর্শকাতর। মাঝে মধ্যে চীন অরুণাচল নিয়ে তার দাবি উত্থাপন করলেও, সেখানে এক ধরনের ‘স্ট্যাটাস কো’ বজায় রয়েছে। বিতর্কিত কাশ্মীরের ওপর দিয়ে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের সড়কপথটি চলে গেছে।

যা বেলুচিস্তানের গাওদারে গিয়ে শেষ হয়েছে। এই সড়কপথের ব্যাপারে ভারতের আপত্তি রয়েছে। এই দুটো বিষয় বাদ রেখে এ মুহূর্তে সীমান্ত উত্তেজনা হ্রাস করা প্রয়োজন। সেখানে ‘স্ট্যাটাস কো’ বজায় থাকুক- আমরা এমনটাই প্রত্যাশা করি। যদি ডোকলাম নিয়ে উত্তেজনা অব্যাহত থাকে, তাতে সুবিধা নেবে তৃতীয় পক্ষ। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

ইতিমধ্যে ভারতের অনুদান তহবিল থেকে বার্ষিক বাজেটের বাইরে আরও ২০ হাজার কোটি রুপি দাবি করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। শুধু তাই নয়, আগামী ৫ বছর প্রতিরক্ষা বরাদ্দ বাড়িয়ে ২৬ লাখ ৮৪ হাজার কোটি রুপি করারও আবেদন করেছে মন্ত্রণালয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ফান্ড ২ লাখ ৭৪ হাজার ১১৩ কোটি রুপি বরাদ্দ দিয়েছিল, যা জিডিপির ১ দশমিক ৬২ শতাংশ। ভারত নয়াদিল্লি ও মুম্বাইয়ে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে করেই বোঝা যায় নয়াদিল্লির ভয়টা আসলে পাকিস্তানকে নিয়ে নয়, বরং চীনকে নিয়েই।

ভারত এখন চুক্তি বলে নিজেরাই এফ-১৬ বিমান তৈরি করবে। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রও তারা কিনছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এটা তো ঠিক এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ‘মিত্র’ হিসেবে চাইছে। দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীনের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর যে বিবাদ তাতে চীনের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়নি ভারত। এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বই শেষ পর্যন্ত ডোকলামে দু’পক্ষকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তারপরও কথা থেকে যায়- আদৌ যুদ্ধ হবে কিনা? শেষ পর্যন্ত হয়তো যুদ্ধ হবে না বরং এক ধরনের ‘স্ট্যাটাস কো’ বজায় থাকবে।

তবে ডোকলাম নিয়ে যে আস্থার ঘাটতির সৃষ্টি হয়েছে, সেই ঘাটতি কীভাবে পূরণ হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন।

ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

tsrahman09@gmail.com

 

যে কারণে চীন-ভারত দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে- BBC

চার সপ্তাহ যাবত ভারত ও চীনের মধ্যেকার সীমান্তে দুদেশের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা চলছে।

উভয় দেশের মাঝে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে।

সীমান্ত বিরোধী নিয়ে ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধও হয়েছিল।

কিন্তু তারপরেও বিভিন্ন জায়গায় বিরোধ এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে এবং মাঝে-মধ্যেই সেটি মাথা চাড়া দেয়।

চীন, ভুটান আর ভারতের সিকিম প্রদেশের সংযোগস্থলে একটি উপত্যকার ভেতর দিয়ে রাস্তা তৈরি করাকে কেন্দ্র করে নতুন বিরোধের সূচনা।

চীন চায় সেখানে একটি রাস্তা তৈরি করতে। কিন্তু যে জায়গাটিতে চীন রাস্তা তৈরি করতে চাইছে সেটি ভুটান ও চীনের মধ্যকার একটি বিরোধপূর্ণ এলাকা।

সে উপত্যকাকে চীন এবং ভুটান-উভয় দেশই দাবী করে। এক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান ভুটানের পক্ষে।

ভারত মনে করে, চীন যদি এ রাস্তাটি তৈরি করে তাহলে কৌশলগতভাবে ভারত পিছিয়ে পড়বে।

এ রাস্তাটির মাধ্যমে চীন এমন একটি জায়গায় পৌঁছে যাবে যেটি ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।

চীন এমন জায়গায় সড়ক নির্মাণ করতে চাইছে যার পাশেই ভারতের ২০ কিলোমিটার চওড়া একটি করিডোর আছে।

এ করিডোরের মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলো মূল ভারতের সাথে সংযোগ রক্ষা করে।

উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে উভয় দেশ সীমান্তে তাদের সামরিক শক্তি বাড়িয়েছে এবং একটি মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে সড়ক নির্মাণ না করার জন্য ভুটানের তরফ থেকে চীনকে আহবান জানানো হয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে বিরোধপূর্ণ এলাকা

 

ভুটান বলছে, এ ধরনের সড়ক নির্মাণের মধ্য দিয়ে চীন আন্তর্জাতিক চুক্তির লঙ্ঘন করছে।

ভারত মনে করে সিকিম রাজ্যটি তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ সিকিম অঞ্চলের মধ্য দিয়ে ভারত চীনের যে কোন আগ্রাসনের জবাব দিতে পারে।

চীন এ বিষয়টি অনুধাবন করতে পারে বলেই সেখানে তাদের কৌশলগত অবস্থান জোরদারের চেষ্টা চালাচ্ছে।

১৯৬২ সালের যুদ্ধে চীনের কাছে ভারত পরাজিত হয়েছিল।

ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী অরুণ জেটলি সম্প্রতি বলেছেন, ১৯৬২ সালের ভারত এবং ২০১৭ সালের ভারত এক নয়।

নিজের ভূখণ্ড রক্ষার জন্য ভারত এখন যথেষ্ট শক্তিশালী বলে মন্তব্য করেছেন মি: জেটলি।

অন্যদিকে চীন মনে করে যে জায়গাটিতে তারা সড়ক নির্মাণ করতে চাইছে সেটি তাদের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড।

ভারতে সেখানে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে মনে করে চীন।

১৯৬২ সালের যুদ্ধের কথা ভারতকে মনে করিয়ে দিচ্ছে চীন। দেশটি বলছে চীন আগের তুলনায় এখন আরো বেশি শক্তিশালী।

চীনের সাথে ভারতের উত্তেজনার আরেকটি কারণ রয়েছে।

তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাইলামা ভারতে বসবাস করছেন, যেটি চীন মোটেও পছন্দ করছে না।

 

চীন-ভারত দ্বন্দ- ড. তারেক শামসুর রেহমান  (আমাদের সময়.কম)

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে সম্ভাব্য ‘হাতি বনাম ড্রাগন ’ যুদ্ধে কেউই লাভবান হবে না। বিশ্ব আসরে প্রতীকী অর্থে ভারতকে তুলে ধরা হয় ‘হাতি’ হিসেবে। অর্থাৎ সিম্বলিক অর্থে ভারতকে হাতির সঙ্গে তুলনা করা হয়। আর চীনকে তুলনা করা হয় ড্রাগন হিসেবে। সাম্প্রতিক সময়ে চীন ও ভুটানের মধ্যবর্তী একটি ছোট্ট উপত্যকা ডোকলাম নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যে এখনো এক রকম যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। এটা বিশ্লেষণ করতে গিয়েই বিশ্লেষকরা হাতি বনাম ড্রাগন এর যুদ্ধের কথা বলছেন। একধরনের ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ চলছে বটে। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে কোনো পক্ষই যুদ্ধে যাবে না এবং ১৯৬২ সালের মতো একটি পরিস্থিতি তৈরি করবে না। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধ হয়েছিল। আর তাতে ভারতের পরাজয় ঘটেছিল। নরেন্দ্র মোদি সরকার এ ধরনের একটি ঝুঁকি গ্রহণ করবেন না। তবে ভারতের লোকসভায় যেসব বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, তাতে দেখা যায় যুদ্ধবাজ কিছু কিছু সাংসদ চীনকে ‘দেখে নেবার’ হুমকি দিচ্ছেন। অর্থাৎ ‘যুদ্ধের’ পক্ষে বলছেন কেউ কেউ! পাকিস্তান নয়, বরং চীনই পাকিস্তানের এক নম্বর শত্রু- এসব কথাও বলছেন কোনো কোনো সিনিয়র রাজনীতিবিদ।

গত প্রায় দুমাস ডোকলাম নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। সেখানে দুই দেশের সেনাবাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। চীন ও ভুটানের মাঝখানে ৮৯ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট এই মালভূমিটি ভুটানের হলেও, চীন এর মালিকানা দাবি করছে। সেখানে চীন এখন একটি সড়ক নির্মাণ করছে। আর তাতেই আপত্তি ভারতের। ভারত এই সড়ক নির্মাণকে তার নিরাপত্তার প্রতি একধরনের হুমকি হিসেবে দেখছে। যদিও ডোকলাম নিয়ে চীন ও ভুটানের মধ্যে দ্বন্দ্ব, সেখানে ভারতের জড়িত হবার কথা নয়। কিন্তু ভারত ও ভুটানের মধ্যকার ৭০ বছরের পুরনো মৈত্রী চুক্তি অনুযায়ী ভারত ‘আমন্ত্রিত’ হয়ে ডোকলামে সৈন্য পাঠিয়েছে। সংকট বাড়লে ভুটান ভারতকে তার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার ‘অনুরোধ’ জানালেও, ভারত তাতে কর্ণপাত করেনি। বরং ডোকলাম মালভূমির ৩৫ কিলেমিটার দূরে অবস্থিত ভারতীয় নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি গ্রাম থেকে সেখানে বসবাসকারীদের সরিয়ে নিয়েছে। সেখানে এখন ভারতীয় বাহিনী ছাউনি ফেলেছে। কৌশলগতভাবে ডোকলাম ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেখান থেকে ২৭ কিলোমিটার দূরে রয়েছে শিলিগুড়ি করিডোর। ভারতের ভয়টা এখানেই। চীন যদি শিলিগুড়ি করিডোরে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, তাহলে ভারতের সাতবোন রাজ্যের সাথে সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তাই ডোকলাম নিজের এলাকা না হওয়া সত্ত্বেও ভারত এখানে সেনা মোতায়েন করেছে। ফলে ডোকলামের কর্তৃত্ব নিয়ে যদি চীন-ভারত যুদ্ধ বাঁধে, তাতে ‘সুবিধা’ নেবে তৃতীয় পক্ষ, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

অনেকেই জানেন চীনকে ‘ঘিরে ফেলার’ একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের তার সামরিক তৎপরতা সম্প্রসারিত করেছে ভারত মহাসাগরে। ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ৬ষ্ঠ ফ্লিন্টের যুদ্ধ জাহাজ মোতায়েন করা হবে। পূর্ব চীন সাগরে বেশ কটি বিতর্কিত দ্বীপ রয়েছে, যে দ্বীপগুলোর মালিকানা নিয়ে চীনের সাথে জাপান ও ফিলিপাইনের দ্বন্দ্ব রয়েছে। এখন এ অঞ্চলে মার্কিন নৌ সেনা মোতায়েনের অর্থ হচ্ছে চীনের উপর পরোক্ষভাবে ‘চাপ’ প্রয়োগ করা। একই সাথে ভারত মহাসাগরে চীনের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। চীন এ অঞ্চল ঘিরে যে ‘মুক্তার মালা’ নীতি গ্রহণ করেছে (বন্দর স্থাপনা, রিফুয়েলিং স্টেশন ইত্যাদি), এটাও ভাল চোখে দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র। এ অঞ্চলে চীনের স্বার্থ খর্ব করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। স্ট্র্যাটেজিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভারত মহাসাগর (ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে রয়েছে বিশ্বের তেলের রিজার্ভের ৬০ ভাগ, আর গ্যাস রিজার্ভের তিন ভাগের এক ভাগ) আগামী দিনে প্রত্যক্ষ করবে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বে চীনের প্রয়োজন রয়েছে রাশিয়ার সমর্থনের। ‘প্রিমাকভ ডকট্রিন’ অনুযায়ী এ অঞ্চলে মস্কো, তেহরান, বেইজিং ও কলম্বের মধ্যে যে ‘ঐক্য’ গড়ে উঠেছিল, সে ‘ঐক্য’-কে দৃঢ় করতেই শি জিন পিং গেল সেপ্টেম্বরে (২০১৬) ভারত সফর করেছিলেন। এর আগে তিনি মস্কো যান। মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্দেশে শি জিন পিং যে বক্তব্য রাখেন, তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেখানে এক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য দেশের প্রভাব বিস্তারের বিরদ্ধে শি জিন পিং হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ছিল এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। চীনা রাষ্ট্রপ্রধান গেল বছরের মাঝামাঝি ব্রাজিলে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনেও যোগ দিয়েছিলেন। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকাও ব্রিকস এর অন্যতম শক্তি। ব্রিকস বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক জোট।
২০৫০ সাল নাগাদ ব্রিকস দেশগুলোর মোট জিডিপির পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ১২৮.৪ ট্রিলিয়ন ডলার (যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান থাকবে ৩৮.৫ ট্রিলিয়ন ডলার নিয়ে)। একই সময় ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্য সম্পর্ক ৩৪০ বিলিয়ন ডলার (২০১২) ডলার থেকে বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ৫০০ বিলিয়নে। সুতরাং চীন ও ভারত কেউই ঝুঁকি নেবে না উভয় দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হোক। চীন ও ভারত, উভয়েরই উভয়ের প্রয়োজন রয়েছে। বাণিজ্য নির্ভর বিশ্ব ব্যবস্থায় এক কেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে উভয় দেশই সোচ্চার। প্রভাব বলয় বিস্তারকে কেন্দ্র করে সম্পর্কে উষ্ণতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে এটা সত্য। কিন্তু ইতিহাস বলে দেশ দুটি এক সময় বন্ধু ছিল। মধ্য পঞ্চাশের দশকে ‘হিন্দি- চিনি ভাই ভাই’ সেøাগান তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। তিব্বতকে কেন্দ্র করে ভারত ও চীন যে ‘পঞ্চশীলা নীতি’ নীতি গ্রহণ করেছিল, যা ন্যাম বা জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন প্রতিষ্ঠায় একটি ভিত্তি দিয়েছিল। তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট হচ্ছে এই পঞ্চশীলা নীতি। যেমন বলা যেতে পারে ইন্দোনেশিয়ার কথা। ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে এই পঞ্চলীলার কথা বলা আছে। মধ্য পঞ্চাশের সেই ‘নেহেরু-চৌএন লাই ইমেজ আবার ফিরে এসেছিল ‘মোদি-শি জিন পিং বন্ধুত্বের মধ্য দিয়ে। এটি এখন কতটুকু কার্যকর হবে, মোদির সেপ্টেম্বরে বেইজিং সফর (২০১৭) দুদেশের সম্পর্ককে কত উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে তা শুধু আগামী দিনগুলোই বলতে পারবে।

এখানে মূল সমস্যা হচ্ছে মানসিকতার। ভারতের ব্যুরোক্রেসি ভারতকে একটি বিশ্ব শক্তি হিসেবে দেখতে চায়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষে এই প্রভাব কাটানো কঠিন। মনমোহন সিং পারেননি। এখন দেখার পালা মোদি কতটুকু পারেন? তবে এটা তো সত্য মোদির নিজস্ব একটা স্টাইল আছে। তিনি রাজনীতিকে পাশে ঠেলে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বেশি। তার চাই উন্নয়ন। চাই বিনিয়োগ। চাই ব্যবসা। সে কারণে পুরনো বৈরিতা ভুলে গিয়ে তিনি প্রথম চীন সফরে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছিলেন বেশি। তার বৈদেশিক নীতির এটাই বড় বৈশিষ্ট্য। তার জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং সর্বশেষ চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া সফরের উদ্দেশ্য ছিল একটাইÑ তার ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচিকে সফল করা। এখন ভারতের সাথে চীনের সীমান্ত ‘দ্বন্দ্ব’ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে মোদি তার ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নিয়ে তিনি বেশি দূর যেতে পারবেন না। তিনি ভারতবাসীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আগামী ২০২২ সালের মধ্যে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সবার জন্য কাজের ব্যবস্থা করবেন। প্রতিবছর ১২০ লাখ কর্মক্ষম মানুষ সেখানে ‘জব মার্কেটে’ প্রবেশ করছে। এদের জন্য কাজ দরকার। চীনের মতোই ভারতকে একটি ‘পণ্যের উৎপাদনশীল’ দেশে পরিণত করতে চান মোদি। চীনের সাথে দ্বন্দ্ব বাড়লে, সেনাবাহিনী চাইবে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ভার বাড়ানোর। ভারত তার নৌ ও বিমানবাহিনী আধুনিকীকরণ করছে। নৌবাহিনীতে মোট ২৮টি সাবমেরিন সংযোজনের (বর্তমানে আছে ১৫টি) উদ্যোগ নিয়েছে ভারত।

বিমানবাহিনীতে নতুন বিমান আসছে। ভারত এখন নিজেই তৈরি করবে এফ-১৬ যুদ্ধ বিমান। লকহিড়ের সাথে চুক্তিও হয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে উত্তেজনা আগামীতে আরও বাড়বে। সীমান্ত সমস্যা, বিশেষ করে ডোকলাম সমস্যার সমাধান যদি না হয়, তাহলে এই উত্তেজনা অন্য অঞ্চলেও সম্প্রসারিত হবে। খুব সংগত কারণেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো তাতে আক্রান্ত হবে, যা এ অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য কোনো ভাল খবর নয়। আগামী মাসে বেইজিং-এ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ব্রিকস এর র্শীষ সম্মেলন। নরেন্দ্র মোদির সেখানে যাবার কথা এবং মোদি শি জিন পিং এর মধ্যে বৈঠকের সম্ভাবনাও বেশি। কিন্তু দুপক্ষ যদি নমনীয় না হয় এবং সেখানে যদি ‘স্ট্যাটাস কো’ বজায় না থাকে, তাহলে আগামীতে ব্রিকস ভেঙে যাবার ঝুঁকিতে থাকবে। তাই এ মুহূর্তে ডোকলাম থেকে সকল পক্ষের সৈন্য প্রত্যাহার জরুরি। দুঃখজনক হচ্ছে দুমাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও কোনো পক্ষই নমনীয় হচ্ছে না। এরই মাঝে লাদাখে ভারত ও চীনা সেনাবাহিনীর মধ্যে হাতাহাতির খবরও সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ফুটেজ সম্প্রতি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেছে। তবে ভারত যুদ্ধের কোনো ঝুঁকি নেবে বলে মনে হয় না। এর অনেকগুলো কারণ আছে।
প্রথমত, যুদ্ধ বেঁধে গেলে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের জন্য বাজেট বরাদ্দের জন্য জোর দাবি করবে। মোদি সরকার সেটা দিতে বাধ্য হবে। ফলে মোদির বহুল আলোচিত ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচি মুখ থুবড়ে পড়বে। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ শুরু হলে চীন ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চল রাজ্যগুলোতে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। চীনের গণমাধ্যম ইতোমধ্যে বলেছে প্রয়োজনে চীন সিকিম স্বাধীন করে দেবে। অরুণাচল নিয়ে চীন তার দাবি পরিত্যাগ করেনি। এক্ষেত্রে চীন অরুণাচলের অংশ বিশেষ দখল করে নিতে পারে। তৃতীয়ত, ডোকলাম থেকে ভারত যদি তার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে না নেয়, তাহলে চীন কাশ্মীরে সেনা মোতায়েন করতে পারে। চীন এটা করতে পারে (?) পাকিস্তানের আমন্ত্রণ রক্ষা করে, যেমনি ভারত করেছে ভুটানের আমন্ত্রণ রক্ষা করে। চতুর্থত, যুদ্ধ বেঁধে গেলে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত তার বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোতে তার সামরিক প্রভাব বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারে। অন্যদিকে চীন চাইবে এই দেশগুলো যাতে চীনের প্রতিপক্ষ হয়ে না ওঠে। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশগুলো তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থে চীনের উপর নির্ভরশীল। তারা চীনবিরোধী কোনো অবস্থান নাও নিতে পারে। পঞ্চমত, যেকোনো যুদ্ধে চীন ভারতীয় পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করতে পারে। ভারতে চীনের রপ্তানি, আমদানির তুলনায় পাঁচগুণ বেশি।

উপরন্তু দক্ষিণ চীন সাগর ভারতের অন্যতম বাণিজ্য পথ। চীন এ পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। চীন দক্ষিণ চীন সাগরভুক্ত দেশগুলোর মাঝে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে। কেননা দেশ দুটি এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যা ছিল চীনের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। এক্ষেত্রে ভারতের ক্ষেত্রেও এমনটি হতে পারে। সুতরাং চূড়ান্ত বিচারে ডোকলাম নিয়ে আদৌ চীন-ভারত যুদ্ধ হবে না। সেখানে ‘স্ট্যাটাস কো’ বজায় থাকবে। তবে এতে করে সমস্যার সমাধান হবে না। ভারতকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে হবে। এক্ষেত্রে চীনও তার সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে পারে। সমস্যার সমাধান সেখানেই নিহিত।

লেখক: অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক