/

যদি এমন হয়- একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্প

মো: রুকুনুজ্জামান রাসেল

প্রকাশিতঃ ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ | সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৭

মধ্য গগনে সূর্য্য তাপ ছড়াচ্ছে। অর্ক এয়ারপোর্ট স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে। চিরদিনের মত ঢাকাকে বিদায় জানানোর জন্য শেষ বারের মত ট্রেন ধরবে অর্ক। ঢাকার উপর অর্কর অনেক রাগ।

বছর দুয়েক আগে খুলনা থেকে একরকম অভিমান করেই ঢাকা এসেছিল অর্ক। খুলনাতে ছোটখাটো ২/১ টা চাকরীর অফার আসছিল বটে, কিন্তু অর্কর ইচ্ছা ব্যাংকে ঢুকবে। আর্থিক সমস্যা থাকায় বাবা মাও খুব চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু অর্কও নাছোড়বান্দা। যতটুকু সময় পেলে মোটামুটি প্রস্তুতি নেয়া যায়, সেই সময়টুকু বাবা মা দিতে চাচ্ছিলনা। শেষমেষ একদিন বাবার সাথে কথা কাটাকাটি হওয়ায় রাগ করে বাড়ি ছেড়েছিল অর্ক। শৈশবের খেলার মাঠ, আড্ডা, আর অনুযা.. সব ছেড়ে এক কাপড়ে এমনই এক দুপুরে ঢাকার ট্রেন ধরেছিল। পণ করেছিল ব্যাংকে চাকরী পেয়েই তবে বাড়ি ফিরবে । অনুযা কেঁদেছিল অনেক।

এই ২ বছর অনুযাকে দেখেনি অর্ক। ইদানিং কথাও হয়না তেমন। ২ বছরে মেয়েটা বদলে গেছে অনেক। ইদানিং শুনছে ওর বিয়ের কথা চলছে। অর্ক বেকার বলেই হয়তো..

গত ২ বছরে অর্ক পাগলের মত খেটেছে। বাসা থেকে টাকা না নিয়ে টিউশনী করে নিজের খরচ চালিয়েছে। রাত দিন ২৪ ঘন্টা এক করে পড়েছে। ১ বছর পড়াশোনার পর অর্ক ব্যাংকে পরপর ভাইভার ডাক পেতে লাগলো। সবগুলোই ছিল হাসিমুখের ভাইভা.. কিন্তু একটা ব্যাংকেও চাকরী হলোনা।

আজ অর্কর ৩০তম জন্মদিন। চাকরীর বয়স শেষ, আশা আর স্বপ্নগুলো লোকাল বাসে উঠে কোথায় যেন চলে গেছে। বাবা মার অভিমান অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। তারাও অপেক্ষা করছিল ছেলের চাকরী পেয়ে বাড়ি ফেরার আশায়।সেই অর্ক আজ বাড়ি ফিরছে .. নি:স্ব নয়নে, রিক্ত হাতে। মা আসার কথা শুনে খুশিতে কেঁদে বলেছে, তুই শুধু ফিরে আয় বাবা!! কিন্তু অর্কের মনে হেরে যাওয়ার কান্না। আর অনুযা.. অর্কর বাড়ি ফেরার কথা যার মনে কোন দাগ কাটেনি, তার কথা ভেবে আর লাভ কি!

দূর থেকে ভেসে আসা ট্রেনের হুইসেল শুনতেই অর্কর সম্বিত ফিরল। কখন যেন চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। গাঢ় একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসলো বুক চিরে। চোখ মুছতে মুছতে ভাবল, স্বপ্ন শেষ.. এখন খুলনায় ফিরে ছোটখাট একটা চাকরীর সন্ধান করবে আর অনুযা.. থাক। সবকিছুই না হয় না পাওয়ার খাতায় লেখা থাক।

ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়ানোর সময় ও খেয়াল করল মোবাইলে ভাইব্রেশন হচ্ছে। বের করে দেখলো একটা মেসেজ এসেছে। ওপেন করে দেখলো তাতে লেখা “Congratulations Mr. Aurko Hasan. You have been finally selected for the position of “Assistant Director” of Bangladesh Bank. Please collect your appointment letter from HRD on 5th April. Thank you.”

অর্ক তো পুরো থ হয়ে গেছে। কয়েকবার মেসেজটা পড়লো কিন্তু কিছু মাথায় ঢুকছেনা ওর। বাংলাদেশ ব্যাংকে অনেকদিন আগে ভাইভা দিয়েছিল বটে অর্ক, কিন্তু কোন ব্যাংকই যখন ডাকেনি, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাইভার কথা তাই আর মনেই রাখেনি ও। কিন্ত এই মেসেজটা!! আচ্ছা কোন বন্ধু ফাজলামী করছে নাতো? একটা কথা মনে পড়তেই অর্ক তড়িঘড়ি করে মেইল ইনবক্স চেক করল। (আজকালকার অনলাইন নিউজ পোর্টাল গুলো হলে এখানে বলতো, একি দেখলেন অর্ক!!) একই মেসেজ মেইল ইনবক্সে জ্বলজ্বল করছে।

অর্ক ধপাস করে বেন্চে বসে পড়লো। দুচোখ দিয়ে মুষলধারে বরিশরণ হতে লাগলো। শরীর ঝাঁকি দিচ্ছে অনবরত। আকাশের দিকে তাকালো অর্ক; তপ্ত রোদ আর নেই। সেখানে শরতের শান্ত শাদা মেঘের ছড়াছড়ি। অর্কের চোখেমুখে এবার হাসির বন্যা। বিধাতা যেন এই মাত্র স্বর্গের চাবি অর্কের হাতে দিয়ে বলেছে,”নে, যা করবি কর!” কী করবে এখন অর্ক? এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে বজ্র মুষ্ঠি করে আকাশের বুকে ঘুসি মারল ও। বিজয়ের উদযাপন বুঝি এমনই হয়।

এরই মধ্যে ট্রেন কখন যেন কাঁকিনাড়া দিয়ে চলতে শুরু করেছে। অর্ক বুঝতে পেরেই ছুট লাগালো। গতি বাড়ছে ট্রেনের। কিন্তু অর্কর গতি অদম্য। ট্রেন হার মানতে চলেছে।

অর্ক আজ বাড়ি ফিরছে.. বাবা মার বুকে.. অনুযার কাছে.. দ্বিগ্বিজয়ীর বেশে।

ঢাকার উপর এখন আর অর্কের কোন রাগ নেই।

লেখক 

আরিফ রহমান

Management Trainee Officer (MTO)

AB Bank Ltd.