/

আমাদের হারিয়ে যাওয়া তারা রা-(পর্ব-২. অলক কাপালী)

মো: রুকুনুজ্জামান রাসেল

প্রকাশিতঃ ৫:০৩ পূর্বাহ্ণ | সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৭

পর্ব-২. অলক কাপালী

 

চোখ বুজে একবার কল্পনা করুন তো পাকিস্তানের মাটিতে বাংলাদেশের কোন ব্যাটসম্যান ইন্ডিয়ান বোলারদের তুলোধোনা করছে আর পাকিস্তানিরা তাই দেখে হাততালি দিচ্ছে। আমি নিশ্চিত আপনি বাংলাদেশ ক্রিকেটের ডাই হার্ট ফ্যান হলে এই দৃশ্য আপনাকে চরম পুলকিত করত।

 

বাস্তবেও ঘটেছিল এমন একবার। সাল ২০০৮। স্থান করাচি,পাকিস্তান। এশিয়া কাপ, ব্যাটিং এ বাংলাদেশ, প্রতিপক্ষ ভারত। ২৪ বছরের এক তরুণ খারাপ সময় কাটিয়ে তখন ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে, নাম অলক কাপালী। হরিজন সম্প্রদায় থেকে উঠে আসা বাংলার প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র ক্রিকেটার। লিস্ট এ তে তখনো ২০ এর নিচের গড় ধারী সেই ছেলেটাই ভারতীয় বোলার দের ছাতু বানিয়ে করল ৮৫ বলে সেঞ্চুরি। এখন কার প্রেক্ষাপটে তেমন কিছু না হলেও ম্যাচ হারাওলেও তখনকার সময়ে এ ছিল এক বিশাল অর্জন। তখনো বাংলাদেশ ক্রিকেটের বাঘ হয়ে উঠেনি, শাবক ছিল, মাঝে মধ্যে দুই একটা গর্জন দিত।

 

যাই হোক , ১৯৮৪ সালের প্রথম দিনেই জন্ম নেয়া অলক কাপালীকে ক্রিকেট বিশ্ব মূলত চেনে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম হাট্রিক করার জন্য। ১৭ টেস্টের ছোট্ট ক্যারিয়ারে স্টাইললিশ লেগ স্পিনে যে ৬ উইকেট পেয়েছিলেন তার তিনটিই ছিল হ্যাট্রিক সহ ২০০৩ এর মুলতানের সেই চির আক্ষেপময় টেস্টে। মূলত মিডল অর্ডার ব্যাটস্ম্যান হলেও এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের সেরা লেগস্পিনার সম্ভবত তিনি ই। ১৪৬ ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচে ৩২ গড়ে আর 2.96 economy তে ২০৯ উইকেট ই বুঝিয়ে দেয় অকালে হারিয়ে না গেলে লেগ স্পিনারের হাহাকার তিনি কিছুটা হলেও দূর করতে পারতেন।

 

ব্যাটিং এ আহামরী প্রতিভাবান না হলেও সবচেয়ে বড় গুণ ছিল দরকারের সময় জলে উঠতেন যার সবচেয়ে রিসেন্ট উদাহরন মেবি ২০১৪ বিপিএল ফাইনালে কুমিল্লাকে একা হাতে জেতানো। তবে ১৭ টেস্টে 17.69 average এ ৫৩৬ রান আর ৬৯ ওডিয়াই তে 19.60 average এ ১২৬০ রান কখনোই তার ব্যাটিং প্রতিভার ছবি ফুটিয়ে তোলে না। আপনি পরিসংখ্যানে বিলিভ করলে অলক কাপালী ঝরে যাওয়া পাতা ,কিন্তু ক্রিকেটীয় সৌন্দর্যে বিলিভ করলে খসে পড়া উল্কাপিন্ড।

 

কাপালীর লাইফের বড় ভুল ডিসিশন তিনি নিজেই নিয়েছিলেন ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে থাকা অবস্থায় নিষিদ্ধ লীগ আই সি এল খেলতে গিয়ে। দলে যখন জায়গা পোক্ত, ব্যাটে বলে পারফরমেন্স ও ছিল ক্যারিয়ার সেরা অবস্থায় তখনি কি বুঝে আই সি এল খেলতে গিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ছেদ ফেললেন তা আজো রহস্য। তবে ঢেকি সর্গে গেলেও যেমন ধান ভানে তিনিও আই সি এল এও ছুটিয়েছিলেন রানের রথ। মাত্র ৪৫ বলে করা তার সেঞ্চুরিটি ছিল আই সি এল এর ইতিহাসে প্রথম সেঞ্চুরি।তবে নিষেধজ্ঞার কবলে ফর্মের তুংগে থেকেও জাতীয় দলকে অনেক দিন সার্ভিস দিতে পারেননি। ২০১১ পাকিস্তান এর বিরুদ্ধে হোম সিরিজ দিয়ে দলে ফিরলেও দলে জায়গা ধরে রাখার মত পা্রফর্ম করতে পারেননি। আমরাও হারালাম আমাদের ক্রিকেট আকাশের আরেক তারাকে।

 

বয়স ৩৩ চলে, নিজের ভুলে নির্বাসনে না গেলে হয়ত সাকিব তামিম মুশি ম্যাশের পাশাপাশি জাতীয় দলে আরেকটা নির্ভরতা থাকতে পারত, ব্যাটে বলে দুটতেই পারফর্ম করার চাপ সাকিবের উপর কিছুটা হয়ত কমত, লেগ স্পিনারের চিরন্তন আক্ষেপ্ ও হয়ত দূর হত।

 

এখনো অবসর নেননি। ঘরোয়া ক্রিকেটে এখনো দাপটের সাথে খেলে যাচ্ছেন। জানিনা আবার ও সেই ২০০৮/৯ এর কাপালী হয়ে জাতীয় দল আর মাতাতে পারবেন কিনা তবে প্রতিভার অপচয় বা অপব্যবহার এর এক চিরন্তন উদাহরন হয়ে তিনি বাংলার ক্রিকেট ইতিহাসে থাকবেন সবসময়।

 

লেখক

কাজী সীরাত

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)