/

বৈশ্বিক ইতিহাস : মিশরীয় সভ্যতা

জব স্টাডি নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিতঃ ৩:৪৫ অপরাহ্ণ | সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৭

পটভূমি :

আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর-পূর্ব অংশে বর্তমানে যে দেশটির নাম ইজিপ্ট, সেই দেশেরই প্রাচীন নাম মিশর। খ্রিষ্টাব্দ পূর্ব ৪০০০ অব্দে মিশরে প্রথম সামাজ্যের উদ্ভব ঘটে। যার একটি ছিল উত্তর মিশর (নিম্ন মিশর) অপরটি ছিল দক্ষিণ মিশর (উচ্চ মিশর)। খ্রিষ্টাব্দপূর্ব ৫০০০ থেকে ৩২০০ অব্দ পর্যন্ত নীল নদের অববাহিকায় একটি রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। সে সময়টাকে প্রাচীন মিশরের ইতিহাসে প্রাক-রাজবংশীয় যুগ বলে। এ সময় থেকে মিশর প্রাচীন সভ্যতায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে শুরু করে।

এরপর খ্রিষ্টাব্দপূর্ব ৩২০০ অব্দ থেকে প্রথম রাজবংশের শাসন আমল শুরু হয়। ঐ সময় থেকে মিশরের ঐতিহাসিক যুগের সূচনা হয়। একই সময়ে নিম্ন ও উচ্চ মিশরকে একত্রিত করে নারমার বা মেনেস হন একাধারে মিশরের প্রথম নরপতি এবং পুরোহিত। তিনি প্রথম ফারাও-এর মর্যাদাও লাভ করেন। এরপর থেকে ফারাওদের অধীনে মিশর প্রাচীন বিশ্বসভ্যতার অগ্রগতিতে একের পর এক উল্লেযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হয়।

 

ভৌগোলিক অবস্থান:

তিনটি মহাদেশ দ্বারা ঘিরে থাকা মিশরের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ মহাদেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত ভূমধ্যসাগরের উপকূলে অবস্থিত। এর উত্তরে ভূমধ্যসাগর, পূর্বে লোহিত সাগর, পশ্চিমে সাহারা মরুভূমি, দক্ষিণে সুদান ও অন্যান্য আফ্রিকার দেশ। এর মোট আয়তন প্রায় চার লক্ষ বর্গমাইল।

 

সময়কাল :

মিশরীয় সভ্যতা ২৫০০ বছরেরও বেশি সময়কাল ধরে স্থায়ী হয়েছিল। প্রাচীন মিশরের নিরবচ্ছিন্ন ও দীর্ঘ ইতিহাসের সূচনা হয় খ্রিষ্টাব্দপূর্ব ৫০০০ অব্দে। বিশেষ করে নবোপলীয় যুগে।

তবে মিশরীয় সভ্যতার গোড়াপত্তন হয় মেনেসের নেতৃত্বে, যা প্রায় তিন হাজার বছর ধরে সমহিমায় উজ্জ্বল ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতকে লিবিয়ার এক বর্বর জাতি ফারাওদের সিংহাসন দখল করে নেয়। ৬৭০-৬৬২ খ্রিষ্টাব্দ পূর্বাব্দে অ্যাসিরীয়া মিশরে আধিপত্য বিস্তার করে। ৫২৫ খ্রিষ্টাব্দ পূর্বাব্দে পারস্য মিশর দখল করে নিলে প্রাচীন মিশরের সভ্যতার সূর্য অস্তমিত হয়।

 

রাষ্ট্র ও সমাজ :

প্রাক-রাজবংশীয় যুগে মিশর কতগুলো ছোট ছোট নগর রাষ্ট্রে বিভক্ত ছিল। এগুলোকে ‘নোম’ বলা হতো। মিশরের প্রথম রাজা বা ফারাও (মেনেস বা নারমার) সমগ্র মিশরকে  খ্রিষ্টাব্দ পূ: ৩২০০ অব্দে ঐক্যবদ্ধ করে একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলেন। যার রাজধানী ছিল দক্ষিণ মিশরের মেম্ফিসে। তখন থেকে মিশরে ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র ও রাজবংশের উদ্ভব। মিশরীয় ‘পের-ও’ শব্দ থেকে ফারাও শব্দের জন্ম। ফারাওরা ছিল অত্যন্ত ক্ষমতাশালী। তারা নিজেদেরকে সূর্য দেবতার বংশধর মনে করতেন। ফারাও পদটি ছিল বংশানুক্রমিক। অর্থাৎ ফারাওয়ের ছেলে হতো উত্তরাধিকার সূত্রে ফারাও।

পেশার উপর ভিত্তি করে মিশরের সমাজের মানুষকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যেমন- রাজপরিবার, পুরোহিত, অভিজাত, লিপিকার,ব্যবসায়ী, শিল্পী এবং কৃষক ও ভূমিদাস শ্রেণি।

মিশরের অর্থনীতি মূলত ছিল কৃষিনির্ভর।উৎপাদিত ফসলের মধ্য উল্লেখযোগ্য ছিল গম,যব, তুলা,পেঁয়াজ,পিচ ইত্যাদি।ব্যবসা-বাণিজ্যেও মিশর ছিল অগ্রগামী। মিশরে উৎপাদিত গম, লিলেন কাপড় ও মাটির পাত্র ক্রিট দ্বীপ,ফিনিশিয়া, ফিলিস্তিন ও সিরিয়ায় রপ্তানি হতো।বিভিন্ন দেশ থেকে মিশরীয়রা স্বর্ণ, রৌপ্য, হাতির দাঁত,কাঠ ইত্যাদি আমদানি করত।

 

নীল নদ :

মিশরের নীল নদের উৎপত্তি আফ্রিকার লেক ভিক্টোরিয়া থেকে। সেখান থেকে নদটি নানা দেশ হয়ে মিশরের মধ্য দিয়ে ভূ-মধ্যসাগরে এসে পড়েছে। ইতিহাসের জনক হেরোডোটাস যথার্থই বলেছেন- মিশর নীল নদের দান।নীল নদ না থাকলে মিশর মরুভূমিতে পরিণত হতো। প্রাচীনকালে প্রতিবছর নীল নদে বন্যা হতো।বন্যার পর পানি সরে গেলে দুই তীরে পলিমাটি পড়ে জমি উর্বর হয়ে যেত। জমে থাকা পলিমাটিতে জন্মাতো নানা ধরনের ফসল।

 

সভ্যতায় মিশরীয়দের অবদান :

প্রাচীন সভ্যতায় মিশরীয়দের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। তাদের ধর্মীয় চিন্তা,শিল্প,ভাস্কর্য,লিখন পদ্ধতি কাগজের আবিষ্কার জ্ঞান বিজ্ঞানচর্চা-সবকিছুই তাদের অবদানে সমৃদ্ধ।মিশরীয়দের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে তাদের জীবনে এমন কোনো দিক নেই যা ধর্মীয় চিন্তা ও বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত না।

 

মিশরীয়দের ধর্মবিশ্বাস :

সম্ভবত প্রাচীন মিশরীয়দের মতো অন্য কোনো জাতি জীবনের সকল ক্ষেত্রে এতটা ধর্মীয় নিয়ম-কানুন অনুশাসন দ্বারা প্রভাবিত ছিল না।সে কারণে মানবসভ্যতার অনেক ধ্যানধারণা,রীতি-নীতি, আচার-অনুষ্ঠানের জন্ম প্রাচীন মিশরে। তারা জড়বস্তুর পূজা করত, মূর্তি পূজা করত, আবার জীবজন্তুর পূজাও করত।বিভিন্ন সময়ে তাদের ধর্মবিশ্বাসের পরিবর্তন ঘটেছে।মিশরীয়দের ধারণা ছিল,সূর্যদেবতা ‘রে’ বা ‘আমন রে’ এবংপ্রাকৃতিক শক্তি, শস্য নীলনদের দেবতা‘ওসিরিস’ মিলিতভাবে সমগ্র পৃথিবী পরিচালিত করেন।তবে তাদের জীবনে সূর্যদেবতা ‘রে’-এর গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি।

মিশরীয়রা মনে করত মৃত ব্যক্তি আবার একদিন বেঁচে উঠবে। সে কারণে দেহকে তাজা রাখার জন্য তারা মমি করে রাখত। এই চিন্তা থেকে মমিকে রক্ষার জন্য তারা পিরামিড তৈরি করেছিল। ফারাওরা ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে দেশ শাসন করতেন। তাঁরা ছিলেন প্রধান পুরোহিত এবং অন্যান্য পুরোহিতদেরও তাঁরা নিয়োগ করতেন।

 

শিল্প :

মিশরীয়দের চিত্রকলা বিশেষভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।অন্যান্য দেশের মতো চিত্রশিল্পও গড়ে উঠেছিল

ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে। তারা সমাধি আর মন্দিরের দেয়াল সাজাতে গিয়ে চিত্রশিল্পের সূচনা করে। তাদের প্রিয় রং ছিল সাদা-কালো। সমাধি, পিরামিড, মন্দির, প্রাসাদ, প্রমোদ কানন, সাধারণ ঘর-বাড়ির দেয়ালে মিশরীয় চিত্রশিল্পীরা অসাধারণ ছবি এঁকেছেন। এসব ছবির মধ্যে মিশরে রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের কাহিনী ফুটে উঠেছে।

 

কারু শিল্পেও প্রাচীন মিশরীয় শিল্পীরা অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। আসবাবপত্র, মৃৎপাত্র, সোনা, রুপা, মূল্যবান পাথরে খচিত তৈজসপত্র, অলঙ্কার, মমির মুখোশ, দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্র, হাতির দাঁত ও ধাতুর দ্রব্যাদি মিশরীয় কারু শিল্পের অসাধারণ দক্ষতার প্রমান বহন করে।

ভাস্কর্য :

প্রাচীন বিশ্বসভ্যতায় মিশরীয়দের মতো ভাস্কর্য শিল্পে অসাধারণ প্রতিভার ছাপ আর কেউ রাখতে সক্ষম হয়নি। ব্যাপকতা, বৈচিত্র্য এবং ধর্মীয় ভাবধারায় প্রভাবিত বিশাল আকারের পাথরের মূর্তিগুলো ভাস্কর্য শিল্পে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে। প্রতিটি ভাস্কর্য মানুষ অথবা জীবজন্তুর সবই ধর্মীয় ভাবধারা, আচার অনুষ্ঠান, মতদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিল। প্রতিটি শিল্পই ছিল আসলে ধর্মীয় শিল্পকলা। সর্বশ্রেষ্ঠ ভাস্কর্য হচ্ছে গিজার অতুলনীয় স্ফিংক্‌স। স্ফিংক্‌স হচ্ছে এমন একটি মূর্তি, যার দেহটা সিংহের মতো কিন্তু মুখ মানুষের। মিশরের সবচেয়ে বড় পিরামিডটি হচ্ছে ফারাও খুফুর পিরামিড। মন্দিরগুলোতে মিশরীয় ভাস্কর্য স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন প্রতিফলিত হয়েছে।

 

লিখনপদ্ধতি ও কাগজ আবিষ্কার :

মিশরীয় সভ্যতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল লিপি বা অক্ষর আবিষ্কার। নগর সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মিশরীয় লিখনপদ্ধতির উদ্ভব ঘটে। পাঁচ হাজার বছর পূর্বে তারা সর্বপ্রথম ২৪টি ব্যঞ্জনবর্ণের বর্ণমালা আবিষ্কার করে। প্রথম দিকে ছবি এঁকে তারা মনের ভাব প্রকাশ করত। এই লিখন পদ্ধতির নাম ছিল চিত্রলিপি।

এই চিত্রলিপিকে বলা হয় ‘হায়ারেগ্লিফিক’ বা পবিত্র অক্ষর। মিশরীয়রা নাল খাগড়া জাতীয় গাছের খণ্ড থেকে তারা কাগজ বানাতে শেখে। সেই কাগজের উপর তারা লিখত। গ্রিকরা এই কাগজের নাম দেয় প্যাপিরাস। যে শব্দ থেকে ইংরেজিতে পেপার শব্দের উৎপত্তি। এখানে উল্লেখ্য, নেপোলিয়ান বোনাপার্টের মিশর জয়ের সময় একটি পাথর আবিস্কৃত হয়, যা রসেটা স্টোন নামে পরিচিত। যাতে গ্রিক এবং ‘হায়ারেগ্লিফিক’ ভাষায় অনেক লেখা ছিল, যা থেকে প্রাচীন মিশরের অনেক তথ্য জানা যায়।

 

বিজ্ঞান :

মিশরীয় সভ্যতা ছিল কৃষিনির্ভর। সে কারণে নীল নদের প্লাবন, নব্যতা, পানিপ্রবাহের মাপ জোয়ারভাটা ইত্যাদি ছাড়াও জমির মাপ তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। এসবের সঙ্গে জ্যোতিষশাস্ত্র ও অঙ্ক শাস্ত্রের ছিল গভীর যোগাযোগ। ফলে এ দুটি বিদ্যা তারা আয়ত্ত করে ছিল প্রয়োজনের তাগিদে। তারা অংক শাস্ত্রের দুটি শাখা জ্যামিতি এবং পাটিগণিতেরও প্রচলন করে। মিশরীয় সভ্যতার মানুষ যোগ, বিয়োগ ও ভাগের ব্যবহার জানত। খ্রিষ্টাব্দপূর্ব ৪২০০ অব্দে তারা পৃথিবীতে প্রথম সৌর পঞ্জিকা আবিষ্কার করে। ৩৬৫ দিনে বছর এ হিসাবের আবিষ্কারকও তারা। প্রাচীন মিশরের অধিবাসীরা সময় নির্ধারণের জন্য সূর্য ঘড়ি, ছায়াঘড়ি, জলঘড়ি আবিষ্কার করে।

 

ধর্মের কারণে মিশরীয়রা বিজ্ঞানচর্চায় আগ্রহী ছিল। তারা পরলোকে বিশ্বাস করত এবং ফারাওরা পরবর্তী জন্মেও রাজা হবেন এই বিশ্বাস তাদের ছিল। তাই তারা ফারাওদের দেহ তাজা রাখার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এ কারণেই মমি তৈরি শুরু হয়। মিশরীয় বিজ্ঞানীরা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পদ্ধতিতে মৃতদেহ পচন থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়।

চিকিৎসাশাস্ত্রেও প্রাচীন মিশরীয়রা বিশেষ অগ্রগতি লাভ করেছিল। তারা চোখ, দাঁত, পেটের রোগ নির্ণয় করতে জানত। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা করার বিদ্যাও তাদের জানা ছিল। তারা হাড় জোড়া লাগানো, হৃৎপিণ্ডের গতি এবং নাড়ির স্পন্দন নির্ণয় করতে পারত।

মিশরীয়রা দর্শন, সাহিত্যচর্চাও করত। তাদের রচনায় দুঃখ হতাশার কোনো প্রকাশ ছিল না। তারা আশাবাদী ছিল। তাদের লেখায় সব সময়ই আনন্দের প্রকাশ দেখা গেছে।

ধারাবাহিক পর্ব – ২ এ থাকছে:  সিন্ধু সভ্যতা। 

[নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা বই অবলম্বনে]