/

বৈশ্বিক ইতিহাস : গ্রিক সভ্যতা

জব স্টাডি নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিতঃ ২:৫০ অপরাহ্ণ | অক্টোবর ১৪, ২০১৭

পটভূমি :

গ্রিসের মহাকবি হোমারের ‘ইলিয়ড’ ও ‘ওডিসি’ মহাকাব্য দুটিতে বর্ণিত চমকপ্রদ কাহিনী মধ্যে লুকিয়ে থাকা সত্যকে খুঁজে বের করার অদম্য ইচ্ছা উৎসাহিত করে তোলে প্রত্নতত্ত্ববিদদের । উনিশ শতকের শেষে হোমারের কাহিনী আর কবিতায়ই তা সীমাবদ্ধ থাকে না, বেরিয়ে আসে এর ভিতরের সত্য ইতিহাস। ঈজিয়ান সাগরের দ্বীপপুঞ্জে এবং এশিয়া মাইনরের পশ্চিম উপকূলে আবিষ্কৃত হয় এক উন্নততর প্রাচীন নগর সভ্যতা। সন্ধান মেলে মহাকাব্যের ট্রয় নগরীসহ একশত নগরীর ধ্বংস স্তূপের। যাকে বলা হয় ঈজিয়ান সভ্যতা বা প্রাক ক্লাসিক্যাল গ্রিক সভ্যতা।

ক্রিট দ্বীপ, গ্রিস উপদ্বীপের মূল ভূখণ্ড, এশিয়া মাইনরের পশ্চিম উপকূলে এবং ঈজিয়ান সাগরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ নিয়ে গড়ে উঠে এই সভ্যতা। এই সভ্যতার অধিবাসীরা ছিল সমৃদ্ধশালী এক সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের অধিকারী। এই সভ্যতাকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা-

১. মিনিয়ন সভ্যতা: ক্রিট দ্বীপে যে সভ্যতার উদ্ভব। এর স্থায়ীকাল ধরা হয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ১৪০০ অব্দ পর্যন্ত।

২. মাইসিনিয় বা এচিয়ান সভ্যতা: গ্রিসের মূল ভূখন্ডে দক্ষিণ অঞ্চলে অবস্থিত মাইসিনি নগরের নাম অনুসারে এর নামকরণ হয়। এই সভ্যতার স্থায়িত্ব ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ১৬০০ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ১১০০ অব্দ পর্যন্ত। ধারণা করা হয় বন্যা অথবা বিদেশি আক্রমণের ফলে এই সভ্যতার অবসান ঘটে।

ভৌগোলিক অবস্থান ও সময়কাল:

গ্রিস দেশটি আড্রিয়াটিক সাগর, ভূমধ্যসাগর ও ঈজিয়ান সাগর দ্বারা পরিবেষ্টিত। গ্রিক সভ্যতার সঙ্গে দুইটি সংস্কৃতির নাম জড়িত। একটি ‘হেলেনিক’ অপরটি ‘হেলেনিস্টিক’। গ্রিক উপদ্বীপের প্রধান শহর এথেন্সকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ‘হেলেনিক সংস্কৃতি’। অপরদিকে গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের নেতৃত্বে মিশরের আলেজান্দ্রিয়াকে কেন্দ্র করে গ্রিক ও অগ্রিক সংস্কৃতির মিশ্রণে জন্ম হয় নতুন এক সংস্কৃতির। ইতিহাসে এ সংস্কৃতি ‘হেলেনিস্টিক সংস্কৃতি’ নামে পরিচিত।

 

সামরিক নগর রাষ্ট্র স্পার্টা :

প্রাচীন গ্রিসে যে অসংখ্য নগররাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল তার একটি ছিল স্পার্টা।  এ নগর রাষ্ট্রের অবস্থান ছিল দক্ষিণ গ্রিসের পেলোপনেসাস নামক অঞ্চলে। অন্যান্য নগর রাষ্ট্র থেকে স্পার্টা ছিল আলাদা। স্পার্টানদের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমরতন্ত্র দ্বারা তারা প্রভান্বিত ছিল। মানুষের মানবিক উন্নতির দিকে নজর না দিয়ে সামরিক শক্তি সঞ্চয়ের দিকে তাদের দৃষ্টি ছিল বেশি। খ্রিষ্টাব্দপূর্ব ৮০০ অব্দে দীর্ঘ যুদ্ধের পর ডোরীয় যোদ্ধারা স্পার্টা দখল করতে সক্ষম হয়েছিল। এই পরাজিত স্থানীয় অধিবাসীদেরকে ভূমি দাস বা হেলট বলা হতো। এরা সুযোগ পেলেই বিদ্রোহ করত।

পরাজিত অধিবাসী যারা ভূমিদাস হতে বাধ্য হয়েছিল তাদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। ফলে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা আর বিদ্রোহ দমন ছাড়া স্পার্টার রাজাদের মাথায় আর কোনো চিন্তা ছিল না।

স্পার্টানদের জীবন স্পার্টা রক্ষার জন্যই নিয়োজিত ছিল।স্পার্টার সমাজ তৈরি হয়েছিল যুদ্ধের প্রয়োজনকে ঘিরে।সরকারের মূল উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের জন্য নাগরিকদের প্রস্তুত করা ও যুদ্ধ পরিচালনা করা।সামরিক দিকে অত্যধিক মনোযোগ দেওয়ার কারণে সামাজিক,রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তারা ছিল অনগ্রসর।

 

গণতান্ত্রিক নগর রাষ্ট্র এথেন্স :

প্রাচীন গ্রিসে প্রথম গণতন্ত্রের সূচনা হয় এথেন্সে। তবে প্রথম দিকে এথেন্সে ছিল রাজতন্ত্র।খ্রিষ্ট পূর্ব সাত শতকে রাজতন্ত্রের পরিবর্তে এক ধরনের অভিজাততন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।ক্ষমতাগুলো চলে আসে অভিজাতদের হাতে।দেশ শাসনের নামে তারা শুধু নিজের স্বার্থই দেখতো। ফলে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।যদিও তাদের পক্ষে ক্ষমতা দখল করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু তাদের নামে কিছু লোক ক্ষমতা হাতে নিয়ে নেয়। তাদের বলা হতো ‘টাইরান্ট’।জনগণের মধ্যে অসন্তোষ এবং বঞ্চিত কৃষকদের মধ্যে বিদ্রোহের সম্ভাবনা দেখা দেয়। ফলে সাত খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মাঝামাঝি সময়ে রাষ্ট্রব্যবস্থায় এক পরিবর্তন আসে। আগে অভিজাত পরিবারের সন্তানগণই অভিজাত বলে গণ্য হতো। এখন অর্থের মানদণ্ডে অভিজাত হিসেবে স্বীকৃতি  দেওয়া হলো।

দেশে মারাত্মক সংকটের সময়ে সব শ্রেণি সর্বসম্মতভাবে কয়েকজনকে সংস্কারের জন্য আহ্বান জানায়।তার মধ্যে সবচেয়ে খ্যতিমান ছিলেন অভিজাত বংশের জন্ম নেয়া ‘সোলন’।তিনি কিছু নতুন আইন প্রণয়ন করেন এবং গ্রিক আইনের কঠোরতা হ্রাস করেন।তিনি ঋণ থেকে কৃষকদের মুক্ত করার জন্য আইন পাস করেন। তাঁর সময় অনেক অর্থনৈতিক সংস্কারও করা হয়।

সোলনের পর জনগণের কল্যাণে তাদের অধিকার দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসেন পিসিস্‌ট্রেটাস এবং ক্লিসথেনিস।তারা জনগণের কল্যাণের জন্য অনেক আইন পাস করেন। তবে চূড়ান্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় পেরিক্লিসের সময়।তার সময়কে গ্রিক সভ্যতার স্বর্ণযুগ বলা হয়ে থাকে।৪৬০খ্রিষ্টাব্দ পূর্বাব্দে ক্ষমতায় এসে তিনি ৩০ বছর ধরে রাজত্ব করেন। তিনি নাগরিকদের সব রাজনৈতিক অধিকারের দাবি মেনে নেন। তিনি এ সময় প্রশাসন,আইন ও বিচার বিভাগে নাগরিকদের অবাধ অংশগ্রহণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন।নাগরিকদের মধ্য থেকে নিযুক্ত জুরি বিচারের দায়িত্ব পালন করত।

পেরিক্লিসের যুগে এথেন্স সর্বক্ষেত্রে উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করে।৪৩০খ্রিষ্টাব্দপূর্ব অব্দে এথেন্সের ভয়াবহ মহামারিতে এক চতুথাংর্শ লোক মৃত্যুবরণ করে।এই মহামারিতে পেরিক্লিসেরও মৃত্যু ঘটে।তাঁর মৃত্যুর পর পরই এথেন্সের দুর্ভোগ শুরু হয়।

জ্ঞান-বিজ্ঞান,দর্শন,সাহিত্য ও রাজনীতি সর্বক্ষেত্রে বিশ্ব সভ্যতায় অবিস্মরণীয় অবদান রাখা নগররাষ্ট্র এথেন্সের পতন হয় সামরিক নগররাষ্ট্র স্পার্টার কাছে।উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় তা ইতিহাসে পেলোপনেসিয়ার যুদ্ধ নামে পরিচিত।খ্রিষ্টাব্দপূর্ব ৪৬০ থেকে ৪০৪ পর্যন্ত মোট তিনবার এই যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। এই যুদ্ধে দুই রাষ্ট্র পরস্পরের মিত্রদের নিয়ে জোট গঠন করে। এথেন্সের মিত্র রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত জোটের নাম ছিল ‘ডেলিয়ান লীগ’।অপরদিকে স্পার্টা তার মিত্রদের নিয়ে যে জোট গঠন করে তার নাম ছিল ‘পেলোপনেসীয় লীগ’।এই মরণপণ যুদ্ধে এথেন্সের মান-মর্যাদা ও স্বাধীনতা বিলীন হয়ে যায়।খ্রিষ্টাব্দপূর্ব ৩৬৯ অব্দে এথেন্স চলে যায় স্পার্টার অধীনে। এরপর নগররাষ্ট্র থিব্‌স্‌ অধিকার করে নেয় এথেন্স। খ্রিষ্টাব্দ পূর্ব ৩৩৮ অব্দে মেসিডোনের (গ্রিস) রাজা ফিলিপ থিব্‌স্‌ দখল করে নিলে এথেন্স মেসিডোনের অধীনে চলে যায়।

 

সভ্যতায় গ্রিসের অবদান :

ভৌগোলিক কারণে গ্রিক নগর রাষ্ট্রগুলো একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকলেও তাদের সংস্কৃতি ছিল অভিন্ন। রাজনৈতিক অনৈক্য থাকা সত্ত্বেও তারা একই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী বলে মনে করত। তাদের ভাষা, ধর্ম, সাহিত্য, খেলাধুলা-সবকিছু তাদের এক সংস্কৃতির বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছিল। এই সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে মূল অবদান ছিল এথেন্সের। আর এই সংস্কৃতির নাম হচ্ছে হেলেনীয় সংস্কৃতি।

 

শিক্ষা :

শিক্ষা সম্পর্কে গ্রিক জ্ঞানী-গুণীরা বিভিন্ন ধারণা পোষণ করতেন। তারা নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের কেউ কেউ মনে করতেন সুশিক্ষিত নাগরিকের হাতেই শাসনভার দেওয়া উচিত। সরকারের চাহিদা ও লক্ষ্য অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থা থাকা উচিত। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল আনুগত্য ও শৃঙ্খলা শিক্ষা দেয়া। স্বাধীন গ্রীসবাসীর ছেলেরা সাত বছর বয়স থেকে পাঠশালায় যাওয়া আসা করত। ধনী ব্যক্তিদের ছেলেদের ১৮ বছর পর্যন্ত লেখাপড়া করতে হতো। কারিগর আর কৃষকের ছেলেরা প্রাথমিক শিক্ষা পেত। দাসদের সন্তানের জন্য বিদ্যালয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। মেয়েরাও কোনো প্রতিষ্ঠানে যেয়ে লেখাপড়া করতে পারত না।

[নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা বই অবলম্বনে]