/

বৈশ্বিক সভ্যতা- রোমান সভ্যতা

জব স্টাডি নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিতঃ ১:৩৬ অপরাহ্ণ | অক্টোবর ২৭, ২০১৭

পটভূমি :

গ্রিসের সভ্যতার অবসানের আগেই ইতালিতে টাইবার নদীর তীরে একটি বিশাল সম্রাজ্য ও সভ্যতা গড়ে উঠে। রোমকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা এই সভ্যতা রোমীয় সভ্যতা নামে পরিচিত। প্রথম দিকে রোম একজন রাজার শাসনাধীন ছিল। এ সময় একটি সভা ও সিনেটও ছিল। রাজা স্বৈরাচারী হয়ে উঠলে তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে খ্রিষ্টাব্দ পূর্ব ৫১০ অব্দে রোমে একটি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। রোমান সভ্যতা প্রায় ছয়শত বছর স্থায়ী হয়েছিল।

 

ভৌগোলিক অবস্থান ও সময়কাল :

ইতালির মাঝামাঝি পশ্চিমাংশে রোম নগর অবস্থিত। ইউরোপ মহাদেশের দেশ ইতালির দক্ষিণে ভূমধ্যসাগর থেকে উত্তর দিকে আল্পস্‌ পর্বত মালা পর্যন্ত বিসতৃত।ইতালি ও যুগোস্লোভিয়ার মাঝখানে আড্রিয়াটিক সাগর। আড্রিয়াটিক সাগর তীরে ইতালির উত্তর-পূর্ব অংশে গড়ে উঠেছিল প্রাচীন সমুদ্রবন্দর এড্রিয়া। ইতালির পশ্চিমাংশেও ভূমধ্যসাগর অবস্থিত। সাগরের এ অংশকে প্রাচীনকালে বলা হতো এটুস্কান সাগর। কৃষি বিকাশের সুযোগ ছিল বলে প্রাচীন রোম ছিল কৃষিনির্ভর দেশ। ফলে রোমের আদি অধিবাসীদের সঙ্গে অনুপ্রবেশকারীদের সংর্ঘষ সাধারণ বিষয় ছিল। যে কারণে এসব সংঘাত-সংর্ঘষের মধ্য দিয়ে রোমানরা যোদ্ধা জাতিতে পরিণত হতে থাকে। রোমীয় ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নানা উত্থান-পতন, ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে খ্রিষ্টাব্দপূর্ব ৭৫৩ অব্দে রোম নগরী প্রতিষ্ঠিত। ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দ জার্মান বর্বর জাতিগুলোর হাতে শেষ পর্যন্ত রোমান সম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন হয়।

 

রোম নগরী ও রোমান শাসনের পরিচয় :

গুরুত্বপূর্ণ টাইবার নদীর উৎসমুখ থেকে প্রায় বারো-তেরো মাইল দূরে সাতটি পর্বত শ্রেণির উপর রোম অবস্থিত। এ জন্য একে সাতটি পর্বতের নগরীও বলা হয়। খ্রিষ্টাব্দপূর্ব ২০০০ অব্দে যে ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠির একদল মানুষ ইতালিতে বসবাস শুরু করে। তাদেরকেই লাতিন বলা হতো। এদের নাম অনুসারে ভাষার নামও হয় লাতিন ভাষা। লাতিন রাজা রোমিউলাস রোম নগরীর প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নাম অনুযায়ী নগরের নাম হয় রোম।

রোমের গণতন্ত্র একদিনে  প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ধাপে ধাপে নানা সংস্কার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রোমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐতিহাসিকরা রোমীয় ইতিহাসকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন। যথা: খ্রিষ্টপূর্ব ৭৫৩-৫১০ অব্দ পর্যন্ত ছিল রাজতন্ত্রের যুগ। এ যুগে সাতজন সম্রাট দেশ শাসন করেন। এ যুগের সর্বশেষ সম্রাট টারকিউনিয়াস সুপারকাসকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর রোমে প্রজাতন্ত্রের সূত্রপাত। এই প্রজাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চলে খ্রিষ্টাব্দপূর্ব ৫০০ থেকে খ্রিষ্টাব্দ পূর্ব ৬০ অব্দ পর্যন্ত। রোমে প্রজাতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে জনগণ বিদ্রোহী নেতা ব্রুটাস এবং অপর এক ব্যক্তিকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে শাসনের সুযোগ প্রদান করে। রাজতন্ত্রের পতনের পর রোমের জনগণ দুভাগে বিভক্ত হয়ে পরে। প্যাট্রিসিয়ান অর্থাৎ অভিজাত শ্রেণি। আর প্লিবিয়ান যারা সাধারণ নাগরিক। ক্ষুদ্র কৃষক, কারিগর, বণিকরা প্লিবিয়ান শ্রেণিভুক্ত।

প্রজাতন্ত্রের প্রথম ২০০ বছর ছিল প্যাট্রিসিয়ান ও প্লিবিয়ানদের মধ্যে সংঘাতের ইতিহাস। সমাজে প্লিবিয়ানরা বঞ্চিত শ্রেণি ছিল। অধিকার বঞ্চিত প্লিবিয়ানরা ক্রমাগত সংগ্রাম করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত প্লিবিয়ানরা কিছু অধিকার আদায় করতে সক্ষম হয়। প্লিবিয়ানদের দাবির মুখে রোমান আইন সংকলিত হতে থাকে। খ্রিষ্টাব্দপূর্ব ৪৫০ অব্দে প্লিবিয়ানরা ব্রোঞ্জপাতে ১২টি আইন লিখিতভাবে প্রণয়ন করে। আন্দোলনের চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে দুজন কনসালের মধ্যে একজন প্লিবিয়ানদের পক্ষ থেকে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এভাবে রোমান প্রজাতন্ত্র গণতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হয়।

রোমে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও ক্রমে দেশটি সম্রাজ্যবাদী শক্তিরূপে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে। স্বল্প সময়ের মধ্যে রোম সমগ্র ইতালির উপর প্রভাব বিস্তারে তৎপর হয়। ১৪৬ খ্রিষ্টাব্দ পূর্ব অব্দ থেকে ৪৬ খ্রিষ্টাব্দপূর্ব অব্দ পর্যন্ত রোমান সভ্যতার অন্ধকার যুগ। ধনী-দরিদ্র সংঘাত, দাস বিদ্রোহ, ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে চরম বিশৃঙ্খলা, হানাহানি, সহিংসতায় উন্মত্ত হয়ে উঠে রোম।

রোমের অর্থনীতি ছিল দাসদের উপর নির্ভরশীল। অমানুষিক নির্যাতনে দাসরা স্পার্টাকাসের নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। দুই বছরব্যাপী তারা তাদের বিদ্রোহ টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। ৭১ খ্রিষ্টাব্দ পূর্ব অব্দে স্পার্টাকাস নিহত হলে বিদ্রোহের অবসানে হয়। চরম নির্যাতন নেমে আসে দাসদের উপর।

অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ছাড়াও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধেও জড়িয়ে পড়ে রোম। ফলে উচ্চাকাঙ্ক্ষী সামরিক নেতারা ক্ষমতায় আসতে থাকে এবং রোমে গৃহযু্‌দ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষমতার দ্বন্দ্বের একপর্যায়ে সমঝোতার ভিত্তিতে তিনজন নেতা একযোগে ক্ষমতায় আসেন, যা ইতিহাসে ত্রয়ী শাসন নামে পরিচিত। বিশাল রোম সম্রাজ্যকে তিন ভাগ করে শাসনের দায়িত্ব নেন অক্টোভিয়াস সিজার, মার্ক এন্টনি ও লেপিডাস। লেপিডাসের দায়িত্বে ছিল আফ্রিকার প্রদেশসমূহ, অক্টোভিয়াস সিজারের দায়িত্বে ছিল ইতালিসহ সম্রাজ্যের পশ্চিম অংশ, এন্টনির দায়িত্বে ছিল পূর্বাঞ্চল। তবে তিনজনের শাসন বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কারণ প্রত্যেকেরই আকাঙ্ক্ষা ছিল রোমের একচ্ছত্র অধিপতি বা সম্রাট হওয়ার। ফলে খুব শীঘ্রই আবার ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়ে যায়। অক্টোভিয়াস সিজার পরাজিত করে লেপিডাসকে, এদিকে মার্ক এন্টনি মিশরের রাজকন্যা ক্লিওপেট্রাকে বিয়ে করে তাঁর শক্তি বৃদ্ধি করে। কিন্তু অক্টোভিয়াস সিজারের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পরাজিত হন। ক্ষমতা দখল করে অক্টোভিয়াস সিজার অগাস্টাস সিজার নাম ধারণ করে সিংহাসন আরোহণ করেন। ইতিহাসে তিনি এই নামেই বেশি পরিচিত। ১৪ খ্রিষ্টাব্দে অগাস্টাস সিজারের মৃত্যু হয়। তাঁর সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য

ঘটনা যিশুখ্রিষ্টের জন্ম। অগাস্টাস সিজারের মৃত্যুর পর পর রোমে আবার বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বিদেশি আক্রমণ, বিশেষ করে জার্মান বর্বর গোত্রগুলোর আক্রমণ তীব্র হতে থাকে। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কোন্দলের কারণে রোমানদের শক্তি ক্ষয় হয়ে যেতে থাকে। রোমের শেষ সম্রাট রোমিউলাস অগাস্টুলাস জার্মান বর্বর গোত্রের তীব্র আক্রমণ প্রতিহত করতে ব্যর্থ হলেন ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সম্রাজ্যে চূড়ান্ত পাতন ঘটে। ইতোমধ্যে খ্রিষ্টান ধর্মের অগ্রযাত্রা শুরু হয় এবং জার্মানদের উত্থান ঘটে।

 

সভ্যতায় রোমের অবদান :

রোম শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, স্থাপত্য সর্বক্ষেত্রে গ্রিকদের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। তারা এই সব বিষয়ে গ্রিকদের অনুসরণ ও অনুকরণ করেছে। তবে সামরিক সংগঠন, শাসন পরিচালনা, আইন ও প্রকৌশল বিদ্যায় তারা গ্রিক ও অন্যান্য জাতির উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে আধুনিক বিশ্ব রোমানদের কাছে বিপুলভাবে ঋণী।

 

শিক্ষা, সাহিত্য ও লিখন পদ্ধতি :

এ সময়ে শিক্ষা বলতে বুঝাতো খেলাধুলা ও বীরদের স্মৃতি কথা বর্ণনা করা। যুদ্ধ বিগ্রহের মধ্যে দিয়ে রোমের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সুতরাং তাদের সব কিছুই ছিল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে। তারপরেও উচ্চ শ্রেণিভুক্ত রোমানদের গ্রিক ভাষা শিক্ষা ছিল একটি ফ্যাশন। ফলে এদের অনেকেই গ্রিক সাহিত্যকে লাতিন ভাষায় অনুবাদ করার দক্ষতা অর্জন করে। রোমের অভিজাত যুবকরা গ্রিসের বিভিন্ন বিখ্যাত বিদ্যাপীঠে শিক্ষালাভ করতে যেত। (শেষ পর্ব)