/

বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার আজকের সম্পাদকীয়

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিতঃ ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ | জানুয়ারি ২৩, ২০১৮

ইয়াবা ও উন্নয়নের মহাসড়ক…সৈয়দ আবুল মকসুদ

মাহাথির মোহাম্মদ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দুই-আড়াই বছর পর আমি মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলাম। তা এখন থেকে প্রায় ৩৫ বছর আগের কথা। তখন মালয়েশিয়া দেশটির এখনকার মতো অবস্থা ছিল না। মাহাথিরেরও নামডাক হয়নি। তিনি তাঁর আগের তিন প্রধানমন্ত্রীর মতোই আর একজন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর পূর্বসূরি আবদুল রহমান, আবদুল রাজ্জাক এবং হোসেন ওন দেশ গঠনে তাঁদের মতো ভূমিকা রেখেছেন। আমি যখনকার কথা বলছি তখন মাহাথির তাঁর উন্নয়ন পরিকল্পনার স্বপ্নের জাল মাথার মধ্যে বুনছিলেন।

আশির দশকের শুরুর মালয়েশিয়া বা কুয়ালালামপুর ছিল অন্য রকম। কুয়ালালামপুরের আশপাশের বিস্তীর্ণ জঙ্গলে বন্য প্রাণীরা নির্ভয়ে বিচরণ করত। পর্যটকেরা তা উপভোগ করতেন। নতুন স্থাপনা উঠছিল, কিন্তু এখনকার মতো কুয়ালালামপুরে আকাশছোঁয়া অট্টালিকা ছিল না। সরকারের প্রশাসনে উচ্চশিক্ষিত কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল কম। ১৯৭২ বা ৮২-তে বাংলাদেশে যত উচ্চশিক্ষিত কর্মকর্তা-কূটনীতিবিদ-প্রকৌশলী ছিলেন, ওই সময় মালয়েশিয়ায় তার চার ভাগের এক ভাগও ছিলেন না। তবে কর্মকর্তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা ছিল। তা না থাকলে মালয়েশিয়ার অবস্থা বাংলাদেশের দশা হতো।

মাহাথিরের ক্ষমতা গ্রহণের সময় তাঁর দেশের হাসপাতালগুলোয় যথেষ্ট ডাক্তার ছিলেন না। দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন অল্প। স্থপতি ছিলেন হাতে গোনা। তাই মালয়েশিয়ার সরকার উচ্চশিক্ষিত আমলা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার প্রভৃতি তৈরি করতে তরুণ-তরুণীদের বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকায় বৃত্তি দিয়ে পাঠাত। আমাদের ঢাকা, চট্টগ্রাম, সলিমুল্লাহ, রাজশাহী, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাস করে দেশে গিয়ে সরকারি হাসপাতালে যোগ দিয়েছেন অনেকে। তাঁদের কেউ কেউ বাংলাদেশ থেকে শুধু ডিগ্রি নিয়ে যাননি, উপরি হিসেবে নিয়ে গেছেন স্বামী, কেউ নিয়ে গেছেন বাঙালি বউ। বাংলাদেশি শিক্ষিতদের তখন মালয়েশিয়া সরকার খুবই কদর করত।

সমুদ্রবেষ্টিত মালয় উপদ্বীপের সভ্যতা ও সংস্কৃতি বাংলার মতো প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ছিল না। যদিও প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল বিপুল। রাবার, টিন, পাম তেল, বনভূমিতে কাঠ ছিল প্রচুর। দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল কিন্তু মানবসম্পদ ছিল না। সেই প্রাকৃতিক সম্পদ টিন, রাবার প্রভৃতি ব্রিটিশ বেনিয়ারা লুট করে নিয়ে যেত। যারা সম্পদের মালিক সেই মালয়বাসী নিজের হাতে তা ব্রিটিশ জাহাজে তুলে দিয়েছে। বিনিময়ে যেটুকু মজুরি পেত তা দিয়ে সন্ধ্যার পর বসে বসে নেশা করে ঝিমাত। নেশাখোর জাতি হিসেবে আদি মালয়বাসীর দুর্নাম ছিল। মালয় জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষিতের হার ছিল খুব কম।

আমি যখন মালয়েশিয়ায় যাই তখন একটি খবর প্রতিদিন শিরোনাম হচ্ছিল। তিন ব্রিটিশ ও অস্ট্রেলীয় নাগরিককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় তাঁরা হেরোইন নিয়ে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করেন, এই অভিযোগে। তাঁদের মৃত্যুদণ্ড মওকুফের জন্য রানি এলিজাবেথ, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী মাহাথিরের কাছে আকুল আবেদন জানান। মাহাথির তাঁদের সে আবেদন অগ্রাহ্য করেন।

মালয়েশীয় সরকার আইন করেছিল যদি কারও কাছে, মালয়েশিয়ার নাগরিক হোক বা বিদেশি হোক, ৭০ গ্রামের বেশি হেরোইন বা ওই জাতীয় মাদকদ্রব্য পাওয়া যায় তাহলে আর কোনো কথা নেই, সোজা প্রাণদণ্ড। তার ফলে প্রথম দিকে বহু নরনারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। মাদক যদি সহজলভ্য না হয় তাহলে তা সেবন করে বুঁদ হয়ে পড়ে থাকার সুযোগ কোথায়? সুতরাং আগে দেশকে করা চাই মাদকমুক্ত।

মাহাথির যখন প্রধানমন্ত্রী হন তখন তাঁর দেশে জনসংখ্যা ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ। সিআইডির এক গবেষকের মতে, আজ বাংলাদেশে মাদকসেবীর সংখ্যা সরকারি হিসাবে ৬৬ লাখ। তবে বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে মনে করে।

মানুষ কী খাবে আর কী খাবে না, সেটা তার মৌলিক অধিকার। যার খুশি রসগোল্লা খাবে, যার ইচ্ছা তামাক খাবে। মৌলিক অধিকার বলতে যা বোঝায় তার ষোলো আনা গ্যারান্টির দেশ এই বাংলাদেশে মাদকসেবন অনেকটাই ফান্ডামেন্টাল রাইট। অফিসকক্ষে, আদালত প্রাঙ্গণের বটগাছের নিচে, হাটে-বাজারে, হাসপাতালের চত্বরে, বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গোপনে-আড়ালে-আবডালে নয়, দিন-দুপুরে পরমানন্দে চলছে মাদক উপভোগ।

মাদকসেবীর সংখ্যা যে হারে বাড়ছে তাতে ২০২১ সালে তা ৩ কোটি অতিক্রম করবে এবং ২০৪১ সালে কত হবে, তা এখনই অঙ্ক কষে বলা সম্ভব। বিষয়টি যে রকম অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে তাতে ২০৩১ সাল নাগাদ পরিবারে ভাই-বোন, বাপ-বেটা, শ্বশুর-পুত্রবধূ, শাশুড়ি-জামাতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী একত্রে মাদক সেবনে সংকোচ বোধ করবে না।

শুধু ইয়াবা-বাণিজ্য করেই বাংলাদেশের উচ্চ-মধ্য আয়ের রিপাবলিক হওয়া সম্ভব। তবে একই সঙ্গে হবে উচ্চ মাদকসেবীদের দেশও। চাটগাঁর এক ইয়াবা ব্যবসায়ী টাটা, বিড়লা, আদমজী, বিল গেটসকে হারাতে পারতেন, কিন্তু ২০১৫-এর আগস্টে র্যাব ও বিজিবির সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। ‘এক বছরের মধ্যে ওই ব্যবসায়ীর ১২টি ব্যাংক হিসাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢুকেছে ১১১ কোটি টাকা।’ [প্রথম আলো, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৮] বর্তমান বিশ্বের ধনকুবেরদের একজন ওই ‘ব্যবসায়ী’ ছিলেন প্রকাশ্যে একটি ছোট্ট মোবাইল যন্ত্রাংশের দোকানের স্বত্বাধিকারী। তাঁর দোকানের আয়তন ছিল ১২ বাই ১৩ ফুট। ‘ওই দোকানের নামেই বিভিন্ন ব্যাংকে তার ১২টি হিসাব খোলা হয়েছে। ওই হিসাবগুলোতেই ইয়াবা বিক্রির টাকা লেনদেন হতো।’

যেকোনো বস্তুর চেয়ে বর্তমানে বঙ্গভূমিতে ইয়াবা ব্যবসাই সবচেয়ে লাভজনক। খুচরা খরিদদারদের কাছে বেচাবিক্রি যা হওয়ার তা অব্যাহতভাবে চলছেই, তবে মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইয়াবার পাইকারি মহাজনদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। তাতে কিছু ইয়াবা বড়ি আটক করা হয়। এখন বছরে উদ্ধার হচ্ছে মাত্র ৪ কোটি বড়ি।

প্রথম আলো তার ‘বছরে ইয়াবা-বাণিজ্য ৬ হাজার কোটি টাকা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ‘জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (ইউএনওডিসি) মতে, উদ্ধার হওয়া মাদকের এই সংখ্যা বিক্রি হওয়া বড়ির মাত্র ১০ শতাংশ। সেই হিসাবে বছরে শুধু ইয়াবা বড়িই বিক্রি হচ্ছে ৪০ কোটির মতো, যার বাজারমূল্য প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা (প্রতিটি দেড় শ টাকা দাম হিসাবে)। এই টাকার অর্ধেকই চলে যাচ্ছে ইয়াবার উৎসভূমি মিয়ানমারে। ইয়াবা বড়ির পেছনে মাদকসেবীদের বছরে যে খরচ, তা বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) বার্ষিক বাজেটের প্রায় দ্বিগুণ (২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিজিবির বাজেট ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা)। আর পুলিশের বাজেটের প্রায় অর্ধেক।’

বিত্তবান বাংলাদেশের কিছু অর্থ বন্ধুরাষ্ট্রে চলে যাচ্ছে এবং বন্ধুদেশ থেকে আসছে স্রোতের মতো বাংলাভাষী বিতাড়িত রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ-সেটা কম আনন্দের কথা নয়। বন্ধুই তো করবে বন্ধুর উপকার। ‘জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয়ের তথ্যমতে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশির ভাগ দেশে ইয়াবা সরবরাহ করে মিয়ানমার। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ইয়াবা পাচার শুরু হয় ২০০৬ সাল থেকে। ২০১২ সালে চীন ও থাইল্যান্ডের মধ্যে চুক্তির পর মিয়ানমারের মাদক উৎপাদনকারীদের জন্য সেসব দেশে পাচার কঠিন হয়ে পড়ে। তখন তারা বাংলাদেশকেই মাদক পাচারের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। মিয়ানমারের ওয়া এবং কোকাং নামের আদিবাসী সম্প্রদায় এই মেথাএম্ফিটামিন পিল বা ইয়াবা উৎপাদনকারী। এই দুই গোষ্ঠীর লোকজন একসময় আফিম ও হেরোইন উৎপাদনে জড়িত ছিল।’ [প্রথম আলো]

পুলিশের সিআইডির গবেষণা থেকে জানা যায়, ২০১০ সালে দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা ছিল ৪৬ লাখ, বর্তমানে তা ৬৬ লাখ। এদের মধ্যে ১৫ বছরের বেশি বয়সের মাদকসেবী ৬৩ শতাংশের বেশি। গত পাঁচ বছরে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৫৪ ব্যক্তির বিরুদ্ধে। শুধু মামলা করেই মাদকের বিস্তার রোধ সম্ভব নয়। সেটা অনেক উপায়ের একটি মাত্র।

মাদক নির্মূল শুধু মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাজ নয়। শুধু পুলিশও পারবে না। গবেষণা করে, লেখালেখি করে, আলোচনা করে মাদকের অভিশাপ থেকে জাতিকে রক্ষা করা যাবে না। জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন সমন্বিত ও সর্বাত্মক উদ্যোগ। প্রশাসন ও পুলিশকে থাকতেই হবে। তার বাইরে মিশনারি মনোভাব নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযানে নামতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বাররা জানেন তাঁদের এলাকায় কারা মাদক ব্যবসা করে এবং কারা সেবনকারী। উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিরাও দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। ভোটে নির্বাচিত হোন বা বিনা ভোটে নির্বাচিত হোন সংসদ সদস্যদের নৈতিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের বেয়াদবির নামান্তর।

মাদক একটি জাতি, লিঙ্গ ও ধর্মনিরপেক্ষ দ্রব্য। নারী, পুরুষ ও সব ধর্মের মানুষই এর শিকার। সুতরাং ধর্মীয় নেতাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা আগে বিভিন্ন বিষয়ে ভূমিকা রাখতেন। এখন মোটরসাইকেলে ঘোরাফেরা করা দলীয় ক্যাডারদের দাপটে তাঁরা মান-ইজ্জত বাঁচাতে গৃহবন্দী। সুতরাং সমাজের যেকোনো উদ্যোগ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সদিচ্ছা ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আমাদের ক্ষমতাসীন দল সব সময় চেঙ্গিস খাঁর বাহিনীর মতো পরাক্রমশালী। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো, মিয়ানমার সীমান্তবর্তী সরকারি দলের অনেক নেতা-কর্মী ইয়াবা ব্যবসায়ীদের ধর্মবাবা।

মাদকাসক্তি কারও ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়। একজন মাদকসেবীর কারণে সমস্ত পরিবারে নেমে আসে অশান্তি। ঘটছে খুনখারাবির মতো অপরাধ। বাড়ছে নারী নির্যাতন। শহরে ছিনতাই ও দস্যুবৃত্তি এবং মফস্বলে মাদকাসক্তদের উৎপাতে বহু মেয়ের স্কুল-কলেজে যাওয়া বন্ধ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, স্কুলের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এই বিষ ঢুকে গেছে। শিক্ষকেরাও বাদ নেই। মাদকাসক্ত হওয়া মানে তিলে তিলে জীবনীশক্তি শেষ করে অকালমৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়া।

কোনো জাতির আর্থসামাজিক সমৃদ্ধি আসে তার কর্মক্ষম মানুষদের উৎপাদনমুখী শ্রমের ফলে। যে দেশের এক-চতুর্থাংশ যুবসমাজ অকর্মণ্য ও মাদকাসক্ত, মাদক নিয়ে ঝিমায় বা ঘুমায়, সে জাতির উন্নতির প্রশ্নে সংশয় থাকবেই। বাংলাদেশে জঙ্গির চেয়ে মাদক অনেক বড় সমস্যা। সমাজকে মাদকমুক্ত করা না গেলে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনবে না।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক। সূত্র: প্রথম আলো

 

সংখ্যালঘুদের উপর হামলার পুনরাবৃত্তি রুখিতে হইবে

রংপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়ার দায় স্বীকার করিয়াছেন রংপুর জেলা পরিষদের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ফজলার রহমান। তিনি সংঘটিত ওই ঘটনায় দায়েরকৃত দুইটি মামলার প্রধান আসামি। ফেসবুকে কথিত একটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করিয়া গত বত্সর ১০ নভেম্বর রংপুরের ঠাকুরপাড়া গ্রামে হিন্দুদের বাড়িতে লুটপাট-ভাঙচুর হয়। ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, গত বৃহস্পতিবার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. তারিক হোসেনের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ফজলার রহমান এই দায় স্বীকার করিয়াছেন মর্মে জানাইয়াছেন রংপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি আরো জানাইয়াছেন যে, ঘটনার দিন মাইকিং করানো, লোকজন সংঘবদ্ধ করা, মানববন্ধন ও সমাবেশে নেতৃত্ব দেওয়ার কাজটি তিনি করিয়াছেন। এই জবানবন্দিতে তিনি দায় স্বীকার করিয়াছেন পুরা ঘটনায় জড়িত থাকিবারও। ইহার পূর্বেও বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে উঠিয়া আসিয়াছিল যে, রংপুরে হিন্দুদের উপর হামলার ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত। হামলার পর পরই সেই সময় অভিযোগ উঠিয়াছিল যে, ওই হামলার ব্যাপারে প্রস্তুতি চলিতেছিল কয়েকদিন ধরিয়াই। মাঝে মিছিল-সমাবেশও হইয়াছে। বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে গ্রামের ৩০টি হিন্দুবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত  হইয়াছিল।

কোনো একটি উপলক্ষ তৈরি করিয়া কিংবা বিনা উপলক্ষেই এলাকা-বিশেষে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করিয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা অত্যন্ত লজ্জার। কিছু দিন পূর্বে নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ ও অভয়নগরে যথাক্রমে দরিদ্র হিন্দুপাড়ায়, সাঁওতাল বসতিতে এবং মালো (জেলে) পাড়ায় ঘটে হামলার ঘটনা। অজুহাত ভিন্ন হইলেও অভিযোগ রহিয়াছে যে, এইসকল হামলার লক্ষ্য হইল ওইসকল সংখ্যালঘুর জায়গা-জমি-বাস্তুভিটা এবং সম্পদ-সম্বল দখল। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, কেহ যদি ধর্মীয় অবমাননাকর পোস্ট দিয়া থাকেন তাহার অপরাধের শাস্তি আইন অনুযায়ীই হইবে। কিন্তু যদি ঘটনাটি উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঘটানো হয়—অর্থাত্, ধর্মকে অবমাননা করা হইয়াছে—এই অজুহাত তুলিয়া ধর্মপ্রাণ নিরীহ মানুষকে উত্তেজিত করা হয়, তবে তাহা অত্যন্ত ঘৃণিত অপরাধ বটে। রামুর উত্তম, নাসিরনগরের রসরাজ বা রংপুরের আলোচ্য ঘটনার টিটুও যে, ফেসবুক জালিয়াতির উদ্দেশ্যমূলক শিকার হইতে পারে, তাহা আমাদের প্রশাসনকে বুঝিতে হইবে। সন্দেহ নাই যে রংপুরের ঘটনা রামু ও নাসিরনগরের ঘটনার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন-নিপীড়ন কোনোক্রমেই কাম্য নহে। আমরা দেখিয়াছি, ভোটের আগে এই ধরনের ঘটনার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এই বত্সরের শেষার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়াও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করিতে পারে স্বার্থান্বেষী মহল। সুতরাং ফেসবুকসহ যেকোনো সামাজিক মাধ্যমে আপত্তিকর মন্তব্যের ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। প্রযুক্তিকে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগাইয়া এইব্যাপারে সদাসতর্ক থাকিতে হইবে। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকেও বুঝিতে হইবে, তাহাদের যেন কেহ কোনো উদ্দেশ্যমূলক অপতত্পরতায় ব্যবহার করিতে না পারে। সর্বোপরি, হামলাকারীদের ব্যাপারে প্রশাসনকে আপসহীন হইতে হইবে। সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

 

আমাদের একটি সুধীসমাজের গণতন্ত্র কি সোনার পাথরবাটি নয়?…আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

আমার একটি কলামে গণতন্ত্র সম্পর্কে একটু আলোচনা করেছি। তাতে নানাজন নানা কথা বলছেন। ঢাকার এক বন্ধু টেলিফোন করে বলেছেন, ‘আপনি আওয়ামী লীগ সরকারের সাফাই গাওয়ার জন্য কলামটি লিখেছেন। তাঁকে বলেছি, যদি আওয়ামী লীগের সাফাই গেয়ে থাকি, তাহলে দোষটা কোথায়? আপনি আগে বলুন, আপনি কোন ধরনের গণতন্ত্র চান? ইংল্যান্ডের ওয়েস্ট মিনস্টার টাইপের গণতন্ত্রের টোরি ভার্সন না লেবার ভার্সন গণতন্ত্র? তিনি বললেন, গণতন্ত্রের একটাই ধরন বা পদ্ধতি। তার কোনো প্রকারভেদ নেই

বলেছি, এখানেই আপনাদের সঙ্গে আমার মতভেদ। ব্রিটেনে টোরিরা ক্ষমতায় এলে সাধারণ মানুষের দুর্দশা বাড়ে। তাদের ওপর ট্যাক্সের বোঝা বাড়ে, বড়লোকেরা ট্যাক্স হলিডে পায়। ওয়েলফেয়ার স্টেটের সেবামূলক খাতে বিরাটভাবে অর্থ বরাদ্দ কমানো হয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমিয়ে যুদ্ধ ও অস্ত্র নির্মাণ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়। লেবার পার্টি ক্ষমতায় এলে ঘটে এর উল্টোটা। সেবা খাতের অর্থ বরাদ্দ বাড়ে। বড়লোকের ওপর ট্যাক্স বাড়ানো হয়। ট্রেড ইউনিয়ন শক্তিশালী হয়।

ঢাকার বন্ধুকে বলেছি, টোরি ও লেবার পার্টি দুটি দলই দেশ শাসন করে গণতন্ত্রের নামে। নির্বাচিত পার্লামেন্টে দুই দলই আইন পাস করে দেশ পরিচালনা করে। এখন এই দুই দলের গণতন্ত্রে কি প্রকারভেদ নেই? প্রকারভেদ থাকলে টোরি, না লেবার—কোন দলের গণতন্ত্র আপনি অনুসরণ করতে চান? কোনটিকে আপনি খাঁটি ওয়েস্ট মিনস্টার ডেমোক্রেসি আখ্যা দেবেন?

অবিভক্ত ভারত দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে যখন স্বাধীনতা লাভ করে, তখন দুটি রাষ্ট্রই ওয়েস্ট মিনস্টার ডেমোক্রেসি অনুসরণ করবে বলেছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পাকিস্তানে রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। তিনি ইচ্ছা করলে প্রধানমন্ত্রীকে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও বরখাস্ত করতে পারেন। যে ক্ষমতা ইংল্যান্ডের রানির হাতেও নেই। এই গণতন্ত্রের নাম ইলেকটিভ ডিকটেটরশিপ। গণতন্ত্র নয়, এই ডিকটেটরশিপও উচ্ছেদ করে জেনারেল আইয়ুব খান বন্দুকের জোরে পাকিস্তানে যে শাসনপদ্ধতি প্রচলন করেছিলেন, তার নাম মৌলিক গণতন্ত্র বা  basic democracy।

পাকিস্তানের এক চিফ জাস্টিস কায়ানি এই গণতন্ত্র সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘It is neither basic nor democracy। এটা মৌলিক নয় এবং গণতন্ত্রও নয়।’ পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ায় ভিন্ন ধর্মের নাগরিকদের অধিকার খর্ব হয় এবং তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হন। গণতন্ত্রে এই ধর্মভিত্তিক ভেদাভেদ নেই। রাষ্ট্রে সবার সমান অধিকার। দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক বলে কেউ নেই।

বাংলাদেশ এই অগণতান্ত্রিক ও গণবিরোধী রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে স্বাধীন হয়েছিল একটি প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। বিশ্বে তত দিনে গণতন্ত্রের উন্নত পদ্ধতি হিসেবে সোশ্যালিজমের আবির্ভাব হয়েছে। তার নাম সোশ্যাল ডেমোক্রেসি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই সোশ্যাল ডেমোক্রেসিকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সংবিধানে সমাজতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল।

এটা বাংলাদেশের ঔপনিবেশিক শাসনতন্ত্রের, সামরিক বাহিনীর পাকিস্তানমনা একাংশ ও নতুন ধনীদের সহ্য হয়নি। তারা দেশে গণতন্ত্র নেই বলে প্রচারণা শুরু করে এবং দেশের প্রথম নির্বাচিত সরকারকে উত্খাত করা হয়। জাতির পিতাকে সপরিবারের হত্যা করা হয়। সমাজতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমকে সংবিধান থেকে বিদায় করা হয় এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে পশ্চিমা পুঁজিবাদী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

কিন্তু সে প্রতিশ্রুতিও তাঁরা রক্ষা করেননি। সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের আইয়ুব খানের অনুসরণে মৌলিক গণতন্ত্রের কায়দায় গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠা করে গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। আসলে এই গ্রাম সরকারের কর্তৃত্বও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ছিল না। ছিল আমলাদের হাতে। গণতন্ত্রের যে মূল কথা ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার বা ধর্মনিরপেক্ষতা, তা সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়। জিয়াউর রহমানের পরবর্তী সামরিক শাসক সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ধ্বংস করে সেখানে বিশেষ ধর্মকে রাষ্ট্রধর্মের স্থান দেন।

দুই সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দুজনের আমলেই ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানের আদলে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের মূল স্তম্ভগুলোকেই ভেঙে ফেলার চক্রান্ত করা হয়েছে। তার পরও প্রচার করা হয় জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন। এ কথা বর্তমান নির্বাচন কমিশনপ্রধানের মুখে শুনে বিস্মিত হয়েছি। রবীন্দ্রনাথ যাদের ‘পণ্ডিতমূর্খ’ বলতেন, বাংলাদেশে কি তাদের সংখ্যা বেড়েছে? জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় চেহারা হলো তাঁর পুতুল পার্লামেন্টে একাধিক দল ছিল। কিন্তু তাদের সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা বা বাজেটের ওপর ভোটাভুটির কোনো অধিকার ছিল না। এটা নাকি বহুদলীয় গণতন্ত্র!

যে ওয়েস্ট মিনস্টার টাইপের গণতন্ত্র আমরা পছন্দ করি, তার চেহারাও সব সময় এক ধরনের ছিল না, ৯০০ বছর আগে যখন ম্যাগনাকার্টা স্বাক্ষরিত হয় এবং রাজার হাত থেকে স্বৈরাচারী ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়, তখন মনে করা হয়েছিল, জনগণের হাতে বুঝি ক্ষমতা এসে গেল। কিন্তু আদপে তা হয়নি। দেখা গেল, ক্ষমতা এসেছে ব্যারন ও লর্ডদের হাতে। গণতান্ত্রিক  অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণকে দীর্ঘকাল সংগ্রাম করতে হয়েছে। ব্রিটেনে প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার এই সেদিনও ছিল না। গত শতকে  ভোটাধিকার আদায়ের জন্য নারীদের আত্মাহুতি দিতে হয়েছে।

ব্রিটেনের গণতন্ত্র প্রথমে সামন্তবাদ, পরে ক্যাপিটালিস্টদের কবজায় চলে যায়। গত শতকের গোড়ায় রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হওয়ার পর ব্রিটেনসহ ইউরোপের কিছু রাষ্ট্র তাদের দেশেও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব  হওয়ার ভয়ে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে আপস করে ওয়েলফেয়ার বা জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গ্রহণে সম্মত হয়। গণতন্ত্রের সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ যুক্ত হয়ে জন্ম নেয় সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র বা সোশ্যাল ডেমোক্রেসি, ব্রিটেনে লেবার পার্টি একটি সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দল। টোরিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা বারবার ক্ষমতায় বসেছে।

আমেরিকা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। কিন্তু ব্রিটেনের সংসদীয় গণতন্ত্র গ্রহণ করেনি। তারা প্রেসিডেনশিয়াল গণতন্ত্রের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ফ্রান্সে দীর্ঘকাল সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু তাদের আর্থ-সামাজিকব্যবস্থার সঙ্গে তার সংগতি না থাকায় তারা প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতি গ্রহণ করে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ব্রিটেনের শাসনাধীন এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ স্বাধীন হয়। তারা স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ গণতন্ত্র অনুসরণ করে। কিন্তু কিছুদিন পর অনুন্নত সমাজব্যবস্থার জন্য বহু দেশ তা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। ইন্দোনেশিয়ায় প্রেসিডেন্ট সুকর্ন গণতান্ত্রিকব্যবস্থার অনেক ছাঁটকাট করেছিলেন এবং তার নাম দিয়েছিলেন কন্ট্রোলড ডেমোক্রেসি বা নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র।

গণতন্ত্র কোনো ধর্ম বা ইজম নয়। একটি প্রক্রিয়া মাত্র। গত ৩০০ বছরে তার পদ্ধতিগত অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। গণতন্ত্র একটি বিকাশমান ধারা। কোনো দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে তার বিকাশ জড়িত। রাতারাতি কোনো দেশে অবাধ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। পাকিস্তানে ও বাংলাদেশে যে গণতন্ত্রের বিকাশ বারবার ব্যর্থ হয়েছে, সমাজের কায়েমি স্বার্থ তার জন্য দায়ী। সামরিক ও অসামরিক কায়েমি স্বার্থ বারবার নিজেদের স্বার্থে গণতান্ত্রিকব্যবস্থাকে উত্খাত করেছে এবং রাষ্ট্র ও আর্থ-সামাজিকব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করেছে। জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের ফলে এই হস্তক্ষেপ বন্ধ হয়ে এখন গণতন্ত্রের কাঠামো ফিরে এসেছে। কিন্তু সমাজ ও অর্থনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে পুরনো প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থার আধিপত্য টিকে রয়েছে।

এই আধিপত্য উচ্ছেদ করার জন্য অতি বিপ্লবী বা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান দিয়ে কোনো লাভ হয়নি। বরং প্রতিক্রিয়াশীল ও ধর্মান্ধ সমাজশক্তিকে সাহায্য করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের মধ্যপন্থা হলো, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আর্থ-সামাজিকব্যবস্থাকে কায়েমি স্বার্থবাদীদের কবজা থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত করা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া। কিন্তু তা রাতারাতি করা সম্ভব নয়। প্রতিক্রিয়াশীলদের শক্তিশালী চক্রান্তের মুখে এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে হবে এবং কখনো দুই পা পিছিয়ে, এক পা এগিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে পূর্ণাঙ্গতা দিতে হবে। রাতারাতি তা সম্ভব নয়।

আরেক পদ্ধতিতে এটা করা যায়। যদি দেশে সমাজ বিপ্লব ঘটানো যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগ সমাজ বিপ্লব ঘটানোর দল নয় এবং সমাজ বিপ্লব ঘটানোর মতো আর্থ-সামাজিক অবস্থাও বাংলাদেশে এখন বিরাজিত নয়। এ অবস্থায় সামন্তবাদ ও উগ্র ধর্মান্ধদের হুঙ্কার এবং নব্য পুঁজিবাদীদের আগ্রাসী থাবা থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে হলে আপাতত আওয়ামী লীগের মধ্যপন্থায় কিছুটা আপস এবং কিছুটা লড়াই করে গণতন্ত্রের দুর্বল কাঠামোটিকে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানানো ছাড়া উপায় নেই। বাংলাদেশের যেসব বুদ্ধিজীবী গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে চিৎকার করেন, তাঁদের বলতে হবে তাঁরা কোন গণতন্ত্র চান এবং তা অর্জনের উপায় কী? ড. কামাল হোসেনদের ও রাজপথের শহীদ নূর হোসেনদের গণতন্ত্র তো অভিন্ন গণতন্ত্র নয়।

সূত্র: কালের কন্ঠ