/

বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার আজকের সম্পদকীয়

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিতঃ ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ | জানুয়ারি ২৭, ২০১৮

খাঁটি পুলিশ ভুয়া পুলিশ যখন একাকার…মশিউল আলম

সকাল সাড়ে ১০ টা। রাজধানীর মগবাজার মোড়ের কাছাকাছি জনাকীর্ণ সড়ক। এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন একটি ব্যাংক থেকে। তাঁর হাতে একটা ব্যাগ, ব্যাগে সাত লাখ টাকা। হঠাৎ চারজন লোক তাঁকে ঘিরে ধরেন, তাঁদের কারও হাতে ওয়াকিটকি, কারও হাতে হ্যান্ডকাফ। তাঁরা নিজেদের পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সদস্য বলে পরিচয় দেন এবং লোকটিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে পাশে দাঁড়ানো একটি মাইক্রোবাসে জোর করে ওঠান। সঙ্গে সঙ্গে মাইক্রোবাস ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে শুরু করে।

রাস্তার লোকজন ‘বাঁচাও! বাঁচাও!’ আর্তচিৎকার শুনতে পায়। তারা দেখতে পায়, ছুটন্ত মাইক্রোবাসটির কাচের জানালায় জোরে জোরে ধাক্কা পড়ছে, সেই সঙ্গে মাইক্রোবাসের ভেতর থেকে ভেসে আসছে মরিয়া চিৎকার: ‘বাঁচাও! বাঁচাও!’
রাস্তার জনতার পক্ষে নীরব দর্শকের ভূমিকায় নির্বিকার থাকা সম্ভব হয় না; তাদের মন ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সক্রিয় হয়ে ওঠে; তারা চিৎকার করতে করতে ছুটন্ত মাইক্রোবাসটির পিছু নেয়। মাইক্রোবাস কিছুদূর যাওয়ার পরই যানজটে আটকে যায়; উত্তেজিত জনতা সেটির কাচের জানালা ভেঙে ফেলে। কোন ফাঁকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ধারী লোকগুলো তাঁদের ওয়াকিটকি-হ্যান্ডকাফ ফেলে লাপাত্তা হয়ে যান, জনতা শুধু অপহৃত হতে যাওয়া লোকটিকে দেখতে পায়। তারপর পুলিশ আসে। জনতা জানতে পারে, যাঁরা লোকটাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তাঁরা ভুয়া ডিবি।

কিন্তু তাঁরা যদি সত্যিই ডিবি পুলিশের সদস্য হতেন বা অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হতেন, তাহলে কী ঘটতে পারত? তাহলে সম্ভবত তাঁরা পালিয়ে যেতেন না। তাঁরা পালিয়ে গেছেন বলেই পুলিশ ও জনতার ধারণা হয়েছে যে ডিবি পুলিশের সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পর্ক নেই, তাঁরা খাঁটি ক্রিমিনাল।
তবে এ ব্যাপারে ১০০ ভাগ নিশ্চিত হওয়াও কঠিন। কারণ, পেশাগত পরিচয় দিয়ে, সাদাপোশাকে কিন্তু সশস্ত্র অবস্থায় ছিনতাই, অপহরণ ইত্যাদি অপরাধে লিপ্ত হয়েছেন, এমন ঘটনার দৃষ্টান্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সদস্যদের মধ্যে একাধিক আছে। এ রকম ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে না বটে, কিন্তু ঘটা যে অসম্ভব নয়, তা এ দেশে এখন সবাই জানে।

মগবাজারের এ ঘটনার খবর ডেইলি স্টার-এ যেদিন ছাপা হয়েছে, সেই একই দিনে প্রথম আলোয় ছাপা হয়েছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের একটা খবর, যেখানে দেখা যাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ভুয়া নন, পুরোপুরি খাঁটি। তাঁরা হলেন সীতাকুণ্ড থানার উপপরিদর্শক নাজমুল হুদা, কনস্টেবল আবুল কাসেম ও আনসার সদস্য ইসমাইল হোসেন।
গত বুধবার রাত ১০টার দিকে তাঁরা গিয়েছিলেন সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের তেলিবাজার গ্রামে। গিয়েছিলেন একটা মাইক্রোবাস নিয়ে, সশস্ত্র অবস্থায়, কিন্তু তাঁদের পরনে ইউনিফর্ম ছিল না। সাদাপোশাকে তাঁরা গিয়েছিলেন ‘আসামি ধরতে’।
প্রসঙ্গক্রমে বলা দরকার, সীতাকুণ্ডে ৫০ টির বেশি জাহাজভাঙা কারখানা আছে, সেগুলোতে অনেক শ্রমিক কাজ করেন, তাঁদের অনেকে উল্লিখিত তেলিবাজার গ্রামের বাসিন্দা। শ্রমিক নিয়োগের ঠিকাদার ফারুক হোসেনও ওই গ্রামের বাসিন্দা। বুধবার রাতে তিনি ও তাঁর ভাই মোহাম্মদ পারভেজ শ্রমিকদের মজুরি দেওয়ার জন্য একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন সেখানে সাদাপোশাকে হাজির হন পুলিশ ও আনসার বাহিনীর ওই তিন সদস্য। তাঁরা দাবি করেন, ফারুকের কাছে ইয়াবা আছে। ফারুকের ভাই পারভেজ তাঁদের কথার প্রতিবাদ করলে তাঁরা পারভেজকে পেটাতে পেটাতে মাইক্রোবাসে তোলার চেষ্টা করেন। তখন দুই ভাই চিৎকার শুরু করলে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসেন এবং সাদাপোশাকধারী সশস্ত্র তিন ব্যক্তির পরিচয় জানতে চান। এতে সীতাকুণ্ড থানার উপপরিদর্শক নাজমুল হুদা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন, তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে সবাইকে চলে যেতে বলেন।

কিন্তু এলাকাবাসী চলে যাওয়ার পরিবর্তে পুলিশের সদস্যদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় লিপ্ত হন; এর একপর্যায়ে ভয়ংকর ঘটনা ঘটে: এসআই নাজমুল হুদা গুলি চালিয়ে দেন। একটি নয়, পরপর মোট নয়টি গুলি ছোড়েন তিনি। গুলিবিদ্ধ হয়ে সাইফুল ইসলাম নামের এক তরুণ মারা যান, আরও দুজন আহত হন। গুলি করতে করতেই তাঁরা মাইক্রোবাসে উঠে ওই জায়গা থেকে চলে যান।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্য, যাঁর দায়িত্ব অন্যায়-অপরাধের শিকার দুর্বল অসহায় মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া এবং অপরাধীদের দমন করা, তিনি নিরপরাধ মানুষকে অপরাধবৃত্তিতে ফাঁসাতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে কী অবলীলায় গুলি চালিয়ে নিরীহ মানুষকে মেরে ফেলতে পারলেন!

অবাক ব্যাপার হলো, এসআই নাজমুল তাঁর দুই সহকর্মীকে নিয়ে মাইক্রোবাসে করে তেলিবাজার নামের যে গ্রামে গিয়েছিলেন, সেটা তাঁদের দায়িত্বের এলাকা থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে। তাঁরা গিয়েছিলেন সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে না জানিয়েই। কিন্তু তাঁরা সরকারের দেওয়া আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং তা ব্যবহার করে অবলীলায় মানুষ হত্যা করে ফিরে গেছেন। তাঁদের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। মানুষ হত্যার মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ করার পরও তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়নি

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে লোকজনকে ‘ফাঁসানো’র অভিযোগ ইদানীং অনেক বেড়েছে। গ্রামে-গঞ্জে সাধারণ মানুষের মুখে ‘পুলিশের জুলুম’ কথাটা আগের চেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। লোকজনকে হয়রানি করে টাকা আদায় করার ঘটনা এতটাই বেড়ে গেছে যে নিরীহ লোকজন ভয়ে ভয়ে থাকে, কখন পুলিশের বদনজরে পড়ে যায়। ঢাকা মহানগরেও যাঁরা পথের পাশে দোকান করেন, বস্তিতে বাস করেন, পুলিশ তাঁদের সহায় নয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংস্থার সদস্যদের একটা অংশের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা সব সময়ই ছিল। তবে সেই অংশটা আগে অনেক ছোট ছিল। এখন যে বড় হচ্ছে, তা সরকার বা পুলিশ কর্তৃপক্ষ স্বীকার করতে চায় না। কিন্তু স্বীকার করা বা না করার ওপর বাস্তবতা নির্ভর করে না। বাস্তব সত্য হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সদস্যদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। গত দুই-তিন মাসেই এমন কিছু ঘটনার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। যেমন গত অক্টোবরে রাজধানীর খামারবাড়ি এলাকায় পুলিশের এক সহকারী উপপরিদর্শক ও তাঁর এক সহকর্মী একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ছিনতাই করার চেষ্টার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন। নভেম্বর মাসে দক্ষিণখান থানার এক উপপরিদর্শক ও তাঁর কয়েকজন সহকর্মী আলাউদ্দিন নামের এক ব্যক্তির দেহ তল্লাশি করার সময় ৪০ হাজার টাকা কেড়ে নেন। আলাউদ্দিন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তরা জোনে এ বিষয়ে লিখিতভাবে অভিযোগ করলে ওই পুলিশ কর্মকর্তা তাঁকে টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন। নভেম্বর মাসেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক ব্যক্তিকে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের দায়ে পুলিশের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অপরাধ দমন যাদের দায়িত্ব, তাদের একটা অংশই যদি অপরাধে লিপ্ত হয় এবং সেই অংশটা যদি ক্রমশ বড় হতে থাকে, তাহলে পেশাদার অপরাধীদের দমন করার কেউ কি থাকে? পুলিশের সদস্যরা যখন নিজেদের পেশাগত ক্ষমতার অপব্যবহার করে নানা ধরনের অপরাধে লিপ্ত হন, তখন কি তাঁদের পেশাদার অপরাধীদের থেকে আলাদা করে চেনা যায়? তখন কি পেশাদার অপরাধীরাও পুলিশ সেজে অপরাধে লিপ্ত হতে প্রলুব্ধ হতে পারে না? মগবাজারের চার অপহরণকারী নিজেদের ডিবি পুলিশের পরিচয় দিয়েছিল এই ভরসায় যে এতে তাদের অপরাধ সংঘটন নির্বিঘ্ন হবে। ঘটনাক্রমে তা হয়নি, কিন্তু তাদের পক্ষে অপরাধ করে নির্বিঘ্নে চলে যাওয়া অসম্ভব ছিল না; ডিবি পুলিশের মিথ্যা পরিচয় তাদের জন্য বাড়তি সুবিধা হতেও পারত।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংস্থার সদস্য পরিচয় দিয়ে লোকজনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা যখন অহরহই ঘটতে থাকে, তখন পেশাদার অপরাধীদের পক্ষে ভীষণ সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। দেশজুড়ে এখন সেই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এটা এমন এক সময়, যখন খাঁটি পুলিশ আর ভুয়া পুলিশ আলাদা করে চেনা কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

প্রশ্ন জাগে, পুলিশ নামের প্রতিষ্ঠানটির মান-মর্যাদা নিয়ে ভাবিত হওয়ার কেউ কি নেই? পুলিশের প্রতি জনসাধারণের আস্থা কমে যাওয়া কি কাউকে চিন্তিত করে না?

প্রশ্ন জাগে, অপরাধীদের দমন করার এবং নিরীহ সাধারণ মানুষকে অন্যায়-অপরাধ থেকে রক্ষা করার আন্তরিক তাগিদ আমাদের এই রাষ্ট্রের কোথাও কি একটুও অবশিষ্ট নেই?
মশিউল আলম: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। সূত্র: প্রথম আলো

 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস

বর্তমানে ১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী কাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করিতেছে। স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাইবার জন্য সর্বশেষ গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় পাইয়াছিল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা। ছয়বার সময় বৃদ্ধির পরও ৩৩টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাইতে ব্যর্থ হইয়াছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ পাস হইবার পর, নিজস্ব ক্যাম্পাস গড়িয়া তুলিবার বাধ্যবাধকতার নির্দেশ প্রদান করিবার পরও তেমন কোনো ফল হয় নাই। জানা গিয়াছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলি শিক্ষার্থী হারাইবার আশঙ্কা হইতে নিজস্ব ক্যাম্পাস গড়িয়া তুলিতে গড়িমসি করিতেছে। যাহারা শহরের প্রান্তসীমায় নিজস্ব ক্যাম্পাস গড়িয়া তুলিয়াছে, তাহারা রক্ষা পাইলেও, কাহারো কাহারো নিজস্ব জমি পড়িয়াছে আশুলিয়া কিংবা সাভারের মতো স্থানে। ফলে দেখা যাইতেছে, তাহারা ক্যাম্পাস গড়িয়া তুলিলেও নগরে অবস্থিত পুরানা ভবনেই প্রধানত কার্যক্রম চালাইয়া যাইতেছে।

নিজস্ব ক্যাম্পাস গড়িয়া তুলিবার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানরক্ষার প্রতিশ্রুতির সহিত প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। যেকোনো দালান খাড়া করাইয়া বিশ্ববিদ্যালয় নাম দিয়া বাণিজ্যিকভিত্তিতে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যূনতম মান কিছুতেই অর্জন সম্ভব নহে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত ক্লাসরুম, ল্যাবসুবিধা, সহশিক্ষা কার্যক্রম, মিলনায়তন, মাঠ এবং যথেষ্ট উন্মুক্ত পরিসর। গুণী-মেধাবি শিক্ষকদের নিয়োগ দিয়া, সেইরকম আদর্শ ক্যাম্পাস গড়িয়া তুলিতে পারিলে, উপরন্তু ছাত্রাবাসের সুবিধা প্রদান করিতে পারিলে শিক্ষার্থীর অভাব হইবে না, যাহাদের অপেক্ষাকৃত উচ্চবেতনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হইবে। কারণ জনবহুল দেশ বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা লইবার জন্য আগ্রহী শিক্ষার্থীর সংখ্যা এত বেশি যে, অনেকেই মানসম্পন্ন পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় চাহিয়াও পাইতেছে না। চটকদারি কার্যক্রম দিয়া দ্রুত কিছু শিক্ষার্থী সংগ্রহ করিয়া দ্রুত মুনাফা অর্জন খারাপ নীতি। বরং ধীরে ধীরে একটি মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিবার কৃতিত্ব অর্জনের দিকে মনোনিবেশ করা উচিত। মুনাফার বিষয়টি তখন আপনাআপনি হাজির হইবে। নূতন-পুরাতন মিলিয়া প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ শিক্ষার্থী এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অধ্যয়ন করিতেছে। তাহাদের সকলেই যে ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান, এমন নহে। অনেকেই কম বেতনের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িবার সুযোগ না পাইয়া, উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী হইয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে বাছিয়া লইতেছে। অনেকের পিতা-মাতা কায়ক্লেশে কিংবা সম্পত্তি বিক্রি করিয়া সন্তানদের লেখাপড়ার খরচের যোগান দিতেছেন। সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বাংলাদেশে অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা হিসাবে উপস্থিত রহিয়াছে। এখন সময় হইয়াছে এই প্রতিষ্ঠানগুলির ন্যূনতম মান অর্জনের। ইহার অন্যতম পূর্বশর্ত হইল ভৌত অবকাঠামো সুনিশ্চিত করা। ছড়ানো ছিটানো ভাড়াকরা দালানঘরের পরিবর্তে নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মাণই হইতেছে সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রাথমিক একটি ধাপ।

প্রশ্ন হইল, যেই নিয়ম রক্ষা করা যাইবে না, সেই নিয়ম কেন প্রবর্তন করা হইয়াছিল? এখন নিয়ম অনুসরণ না করিলে তাহার শাস্তি কী? বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়াছিল ব্যর্থ হইলে ২০১৮ সালের ১লা জানুয়ারি হইতে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করিয়া দেওয়া হইবে। কিন্তু বাস্তবে তাহাও সম্ভব হয় নাই। চট করিয়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করিয়া দেওয়া যায় না, কারণ উহার সহিত শত শত কিংবা হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভাগ্য জড়িত থাকে। ফলে বিষয়টি যথেষ্ট জটিল। এইক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে যেমন দায়িত্বশীল আচরণ করিতে হইবে, তেমনি মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) সঙ্গতিপূর্ণ আচরণ করিতে হইবে। তবে ইহা সঠিক যে, এই পর্যায়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির দিকেই অভিযোগের অঙ্গুলি নির্দেশ করিতে হইবে। যথেষ্ট হইয়াছে, আপনাদের যথেষ্ট সময় দেওয়া হইয়াছে, আপনারা যেমন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, নগর হইতে দালান সরাইয়া সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় গড়িয়া তুলুন, নগরের বাহিরে বা নগরের উপকণ্ঠে।  সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

 

সব অসমতা পরিত্যাজ্য না হলেও সমতাই মানবসমাজের কাম্য..ড. সা’দত হুসাইন

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অ্যাঙ্গাস ডিটন একটি চমত্কার নিবন্ধ লিখেছেন। তিনি বলেছেন, সব অসমতাকে একভাবে দেখলে ঠিক হবে না। অসমতা সমরূপী (Homogenous) নয় কিংবা সম-অণুবিন্যস্ত (Holistic) নয়। উদ্যোগ ও বুদ্ধিদীপ্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে উদ্যোক্তার আয়-উপার্জন বাড়ে। এ প্রক্রিয়ায় একই সঙ্গে বেকার মানুষের কর্মসংস্থান হয়। তাদেরও রুজিরোজগার বাড়ে, তবে তা উদ্যোক্তাদের তুলনায় অনেক কম। উদ্যোক্তাদের এ ধরনের কর্মোদ্যোগ তাদের আয়-সম্পদ বাড়ালেও একে পরিত্যাজ্য বিবেচনা করা সঠিক হবে না। অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য নিরসনের জন্য উদ্যোক্তার বাস্তব (Real) বিনিয়োগ প্রসূত অসমতাকে মেনে নিয়ে সমাজকে উত্পাদনমুখর ও শান্তিপূর্ণভাবে সচল রাখতে হবে। একে শোষণমুখী উত্পাদন বা শোষণ-সঞ্জাত অসমতা বলতে ডিটন রাজি নন। অনেকেই তাঁর এই মন্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করে।

আরেক ধরনের অসমতা সৃষ্টি হয় অনৈতিক অন্যায় কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। শ্রমিক শোষণ, ভোক্তাস্বার্থ ক্ষুণ্ন করে অতি লাভ (Super profit) অর্জন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন, কালোবাজারি, চোরাচালান, মাদকের কারবার, খুন, গুম, অপহরণ, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবজি, দখলবাজি, সিন্ডিকেটবাজি, টেন্ডারবাজি ও নানা ধরনের দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আয় ও সম্পদ অর্জন করে ধনিক শ্রেণি যে অসমতার জন্ম দেয়, তাকে কোনো রকমে সমর্থন করা যায় না। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষকে যন্ত্রণা দেয়, নাগরিকের অধিকার ও মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে। জনগণের মধ্যে যন্ত্রণাবোধ, হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ফলে সমাজে অস্থিতিশীলতা ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। পরিণামে একসময় সামাজিক কাঠামো, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্র ভেঙে পড়ে, দেশে অচল অবস্থার সৃষ্টি হয়। বিদ্রোহ, বিপ্লব কিংবা গণ-অভ্যুত্থান ঘটা বিচিত্র নয়।

ডিটন তাই আয় ও সম্পদ আহরণ তথা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ডে ন্যায্যতা ও ন্যায়াচরণের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচারে ন্যায়াচরণের সংজ্ঞা নির্ধারণে নানা ধরনের বিতর্ক থাকলেও মোটা দাগে ন্যায়াচারণ কিংবা নৈতিক পদক্ষেপ চিহ্নিত করতে মানুষের খুব একটা কষ্ট হয় না। ফলত সীমিত পরিসরে হলেও এ ব্যাপারে স্থানীয় সমাজ ও বিশ্ব অঙ্গনে এক ধরনের ঐকমত্যের সৃষ্টি হয়েছে। ন্যায়াচরণের এই সীমারেখার মধ্যে অবস্থান করলে সমাজে সুখ-শান্তির সঙ্গে সমৃদ্ধিরও দেখা মেলে। ফিলিপাইনের একজন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, যে দেশে দুর্নীতি থাকে না, সে দেশে দারিদ্র্যও থাকে না। সহজ-সরল কথা হলেও এর তাত্পর্য অতি গভীর এবং সুদূরপ্রসারী। ঘুরেফিরে দেখা যায়, অনৈতিক লেনদেন ও দুর্নীতির মাধ্যমে এক শ্রেণির মানুষ রাতারাতি অগাধ সম্পদের মালিক হয়ে পড়ে। এর ফলে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। শুধু তা-ই নয়, তারা সমাজে খারাপ দৃষ্টান্তের জন্ম দেয়। অন্যান্য মানুষ দুর্নীতি করে সম্পদ আহরণের জন্য উত্সাহিত হয়। সমাজে অস্থিরতা ও আচার-আচরণে নৈরাজ্য নেমে আসে। যারা নিচুস্তর থেকে অন্যায় ও দুর্নীতির মাধ্যমে ধনাঢ্য হয়ে পড়ে তারা সাধারণত ধরাকে সরা জ্ঞান করে। সমাজের শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের তারা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, তাঁদের সম্পর্কে কটূক্তি করে, সুযোগ পেলে তাঁদের অপমান করে। দরিদ্রদের তারা শোষণ করে, তাদের দমন-পীড়নে লিপ্ত হয়। অসমতার যন্ত্রণা তাদের কারণে বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

ডিটন আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের নীতি, সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড অসমতা সৃষ্টিতে সহায়তা করে, অসমতা বাড়িয়ে দেয় এবং অসমতা টিকিয়ে রাখে তথা একে স্থায়ী রূপ দেয়। সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এক শ্রেণির লোক দেশের সম্পদ, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ এবং সর্বোপরি জনসাধারণের সম্পদ লুটপাট করে, জবরদখল করে প্রথমে সম্পদশালী, পরে ব্যবসায়ী, পুঁজিপতি বা শিল্পপতি হিসেবে আবির্ভূত হয়। কোনো কোনো সময় সমানতালে এসব চলতে থাকে। একে বলে সাঙাত পুঁজি বা Crony Capitalism। এ ধরনের পুঁজিপতিরা বাজার অর্থনীতির মূলনীতি বা অবাধ প্রতিযোগিতা মানে না, এরা সরকার কর্তৃক আরোপিত বিধি-নিষেধের আড়ালে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে, নতুন উদ্যোক্তা ও প্রতিযোগীদের বাধা দেয়। ভোক্তার গলা কাটে, মাত্রাতিরিক্ত লাভ করে। তারা বাজারে একাধিপত্য বা ‘চক্রাধিপত্য’ কায়েম করে। প্রতিযোগিতাপূর্ণ মুক্তবাজারের মূল চেতনা পদদলিত করে। এভাবে সৃষ্টি হয় বৈষম্য বা অসমতার পাহাড়।

বাংলাদেশের দৃষ্টান্ত ব্যাপারটিকে আরো পরিষ্কার করবে। দেশে হাতে গোনা দু-একজন ব্যবসায়ী-শিল্পপতি ছাড়া প্রায় সবাই নানা অবৈধ উপায়ে, বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ের সরকারি নেতাদের, সরকারি-আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের পদস্থ নির্বাহী, নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সম্মতিতে বা যোগসাজশে অপ্রতিরোধ্যভাবে লুটপাটের মজাদার খেলায় মেতে ওঠে। লুটেরাদের টার্গেট হচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রাজস্ব বোর্ড, ইউটিলিটি সার্ভিসেস (বিদ্যুত্, গ্যাস, পানি, টেলিফোন ইত্যাদি), বন্দর ও পরিবহন সংস্থা, ভূমি কর্তৃপক্ষ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকারি সম্পদ বণ্টন ও আর্থিক সুবিধাদানকারী কর্তৃপক্ষ। এসব কর্তৃপক্ষের অসাধু নির্বাহীদের অনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রভাবিত করে এরা ফাও সুবিধা হিসেবে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

সম্পদ আহরণের জন্য যেসব লুটেরা-ধনী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হানা দিতে চায় বাংলাদেশে তারা প্রথমেই টার্গেট করে ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান (NBFI)। কোটি কোটি আমানতকারীর সঞ্চয় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় সুরক্ষণে ওয়াদাবদ্ধ হলেও বাস্তবক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠান লুটেরা হায়নাদের আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত হয়ে কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে আছে। ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর সাহায্য-সমর্থন পেয়ে লুটেরাচক্র কখনো ঋণগ্রহীতা হিসেবে, কখনো উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় সমুদয় অর্থ-সম্পদ হাতিয়ে নিয়েছে। কপর্দকশূন্য অনেক প্রতিষ্ঠানে মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে, জনসাধারণের টাকা ভর্তুকি হিসেবে দিয়ে সরকার এদের বাঁচিয়ে রেখেছে। বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের আস্থা হারাতে বসেছে। শুধু তা-ই নয়, আর্থিক খাতকে রক্তশূন্য করে লাখো কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। এমনকি জনগণের অর্থ-সম্পদের শেষ সুরক্ষিত প্রকোষ্ঠ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাণ্ডার থেকে বৈদেশিক মুদ্রা চুরি হয়ে গেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে দায়ী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা হলেও তাঁদের কাউকে আইনি প্রক্রিয়ায় দায়বদ্ধ করা হয়নি। অবৈধ সম্পদের উঁচু দেয়ালের আড়ালে সাঙাত পুঁজিবাদের হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরে রয়েছে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ বা রাজস্ব প্রশাসন। দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও অঢেল সম্পত্তির মালিক ধনিক শ্রেণি রাজস্ব প্রশাসনকে তাদের হাতের কবজায় আটকে ফেলেছে। যে টাকা সরকারি ভাণ্ডারে জমা হওয়ার কথা তার একটা বিরাট অংশ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দুর্নীতিবাজ ধনাঢ্য শ্রেণি ভাগাভাগি করে সরিয়ে নিয়েছে। একেকটি সমঝোতা-উত্তর লেনদেনের মাধ্যমে ব্যবসায়ী-শিল্পপতি ও ধনাঢ্য শ্রেণি শত শত কোটি টাকা ফাও আয় (Unearned income) হিসেবে বাগিয়ে নিয়েছে। ক্ষমতাশ্রিত দুর্নীতিবাজরা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে যে কোটি কোটি টাকা অনুপার্জিত আয় হিসেবে হাতিয়ে নিচ্ছে, তা অসমতা বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এরপর রয়েছে ইউটিলিটি সংস্থাগুলো। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও ধনিক শ্রেণির ইউটিলিটি বিল যেখানে প্রকৃতপক্ষে শত শত কোটি টাকা হওয়ার কথা, সেখানে নানা ধরনের অনৈতিক কারসাজির মাধ্যমে তা হয়তো মাত্র কয়েক কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। বিনিময়ে এসব সংস্থার দুর্নীতিবাজ নির্বাহী ও কর্মচারীরা অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে বিরাট অঙ্কের টাকা আয়-উপার্জন করেন। দুই পক্ষই অঢেল সম্পদের মালিক হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইউটিলিটি সংস্থাগুলো তথা সরকার। বিদ্যুত্, গ্যাস, টেলিফোন, পানির বিলে এই কারচুপি সবচেয়ে বেশি হয়। এসব সংস্থার নিম্নস্তরের কর্মচারীরাও কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন। সমাজে অসমতা সৃষ্টির জন্য তাঁরাও যে দায়ী এতে সন্দেহ নেই।

অনৈতিক স্বজনতোষণ চলে ভূমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে, বন্দর সুবিধা ও অন্যান্য সরকারি সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে। মালামাল পরিবহনে ও প্রাধিকার নির্ধারণে, জমি ক্রয়, লিজ কিংবা ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বজনচক্রকে এত বেশি সুবধাি দেওয়া হয় যে মূল ব্যবসা বা উত্পাদনকে ডিঙিয়ে ভর্তুকি সংগ্রহ এবং মূল্যবান সুবিধা সংগ্রহ মূল উপজীব্য হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র মানুষ এসবের খোঁজখবর রাখে না। অথচ তাদের দেওয়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর থেকে এসব সুবিধা স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, তারা আরো ধনবান হচ্ছে। বৈষম্য বা অসমতা বাড়ছে। ক্ষমতাধরদের অনুগ্রহ-অনুদানে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে ধনীদের সম্পদ ক্রমে বেড়ে উঠছে। বৈষম্য স্থায়ী রূপ পরিগ্রহ করছে। অর্থ ও ক্ষমতাধরদের সমর্থন সংযোগে বলীয়ান হয়ে তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্নীতিবাজ সদস্যদের নির্লজ্জভাবে প্রভাবিত করছে। নিরীহ সজ্জন ও অসহায় দরিদ্র মানুষের ওপর জুলুম করছে। সম্পদবৈষম্যের সঙ্গে জোর-জুলুম, অত্যাচার-নিপীড়ন বাড়ছে। অসহায়ত্বের মাপকাঠিতে দারিদ্র্য তীব্রতর হচ্ছে।

ধনীদের সন্তানরা দেশে-বিদেশে সর্বোচ্চ মানের শিক্ষা পাচ্ছে। ধনী পরিবারের মানবসম্পদ বাড়ছে। গরিব মানুষের সন্তানদের সঙ্গে দুস্তর ব্যবধান সৃষ্টি হচ্ছে। উত্তরাধিকার আইনের বদৌলতে ধনাঢ্য ব্যক্তির সন্তান সুঠাম ভিত্তির পুঁজি পেয়ে যাচ্ছে। তার ব্যবসা-বাণিজ্য বা শিল্পোদ্যোগ নির্বিঘ্নে এগিয়ে যাচ্ছে। তার ধন-সম্পদ বাড়ছে। এভাবে পুরুষানুক্রমে অসমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যত দিন সমাজে ব্যক্তিমালিকানার স্বীকৃতি অবারিত থাকবে অসমতা তত দিন বেড়েই চলবে। এর থেকে নিস্তার নেই।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যে তিনটি বিষয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তা হচ্ছে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। এই তিন স্তম্ভকে সুঠাম বন্ধনীতে আবদ্ধ করে রেখেছে যে শক্তি তার নাম সমতা।

আসলে মানবিক মর্যাদার ঊর্ধ্বে মানবসমাজে আর কিছু নেই। সমতাই নিশ্চিত করতে পারে মানবিক মর্যাদা। অসমতা যতই নৈতিকতাপ্রসূত ও দুর্নীতিমুক্ত উদ্যোগে সঞ্জাত হোক না কেন, সত্যিকার মানবকল্যাণ নিশ্চিত করতে হলে চূড়ান্ত পর্বে তাকে সমতার মিলনভূমিতে আসতে হবে। সেটিই হবে মানুষের চরম বিজয়। মানবিক মর্যাদার সর্বোত্তম বিকাশ।

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান

সূত্র: কালের কণ্ঠ

 

জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার..মুহম্মদ জাফর ইকবাল

এ বছরটা আমার জন্য খুব ভালো একটা সংবাদ দিয়ে শুরু হয়েছে। বছরের শুরুতেই জানতে পেরেছি, এ বছর থেকে ছেলেমেয়েদের আলাদা আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আলাদা আলাদা ভর্তি পরীক্ষা দিতে হবে না। সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলে যেন সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারে তার ব্যবস্থা করা হবে। আমি মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে কী ভাষায় কৃতজ্ঞতা জানাব বুঝতে পারছি না, তিনি যদি এ ব্যাপারটি নিয়ে আগ্রহ না দেখাতেন, এ দেশে সেটি কখনও ঘটত বলে মনে হয় না।

আমি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সঙ্গে একেবারে গোড়া থেকে জড়িত ছিলাম। কয়েক বছর যাওয়ার পর যখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়তে লাগল তখন থেকেই আমি টের পেতে শুরু করলাম যে এই ভর্তি পরীক্ষার চেয়ে অমানবিক বিষয় আর কিছু হতে পারে না। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ছেলেমেয়েরা সারারাত বাসে বসে অন্য আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসে, তাদের একটা বাথরুমে পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ থাকে না। না ঘুমিয়ে, না খেয়ে, বিশ্রাম না নিয়ে তারা কী ভর্তি পরীক্ষা দেয় আমি জানি না। এক বছর ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসে বাস থেকে নামার সময় অন্য একটি বাসচাপায় একটা ছেলে মারা গেল, আমার মনে হচ্ছিল এই ছেলেটির মৃত্যুর জন্য কোনো না কোনোভাবে নিশ্চয়ই আমরাই দায়ী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা সিটের জন্য দেশের ছেলেমেয়েরা পাগলের মতো চেষ্টা করে। যে ছেলে বা মেয়ে যত বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারে, কোনো একটি পাবলিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ তার তত বেশি বেড়ে যায়। ভর্তি পরীক্ষা দিতে অনেক টাকার দরকার। শুধু যে ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার জন্য টাকা দিতে হয় তা নয়, পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় অভিভাবকদের সঙ্গে যেতে হয়, গাড়ি ভাড়া-ট্রেন ভাড়া দিতে হয়। হোটেল ভাড়া করে সেখানে থাকতে হয়, খেতে হয়। এতগুলো টাকা খরচ করার ক্ষমতা সবার থাকে না। তাই ঘুরেফিরে বড়লোকের ছেলেমেয়েরা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারে। গরিবের ছেলেমেয়েরা শুধু বাড়ির কাছের একটি-দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে পারলেই নিজেদের ভাগ্যবান মনে করে। তাই ভর্তি পরীক্ষা শেষে দেখা যেত বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে বড়লোকের ছেলেমেয়েরা ভর্তি হয়েছে, এই কলুষিত সিস্টেমে গরিবের ছেলেমেয়েরা ছিটকে পড়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মেয়েদের। বাবা-মা অনেক সময় ছেলেদের দেশের নানা জায়গায় একা একা পরীক্ষা দিতে দিয়েছেন, মেয়েদের সেভাবে যেতে দিতে সাহস পাননি। তাই মেয়েরা তুলনামূলকভাবে কম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগও পেয়েছে কম।

শুধু যে পরীক্ষা দেয়ার খরচ তা নয়, দেশে এখন ভর্তি কোচিং নামে বিশাল একটা বাণিজ্য শুরু হয়েছে। যদি কেউ স্কুল-কলেজে লেখাপড়া না করে শুধু ভর্তি কোচিং করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যেতে পারে তাহলে বুঝতে হবে আমাদের সিস্টেমে একটা বিশাল গলদ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দায়িত্ব হচ্ছে ভালো ছেলেমেয়েদের বেছে নেয়া, যদি কোচিং সেন্টারগুলো তাদের ছেলেমেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে গছিয়ে দিতে পারে তাহলে আমাদের দুশ্চিন্তার কারণ আছে। এই ভর্তি কোচিংয়ে যে সত্যি সত্যি কোনো লাভ হয় তার কোনো প্রমাণ আমার কাছে নেই। আমার কাছে বরং উল্টো প্রমাণ আছে- যেখানে একজন শুধু আমার মুখের কথাকে বিশ্বাস করে নিজে নিজে পড়াশোনা করে ভর্তি পরীক্ষায় অসাধারণ ভালো করেছে। কিন্তু এ কথা ক’জন বিশ্বাস করবে? পথেঘাটে পর্যন্ত পোস্টার লাগানো থাকে, যেখানে ভর্তি পরীক্ষায় ভালো ফল করা ছেলেমেয়েদের ছবি দিয়ে কোচিং সেন্টার বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে।

আজ থেকে ছয়-সাত বছর আগে আরও একবার সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তখন ডক্টর প্রাণ গোপাল দত্ত ভাইস চ্যান্সেলরদের সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের সভাপতি ছিলেন। মন্ত্রণালয় থেকে আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল এ দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের সামনে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা কীভাবে নেয়া যায় তার ওপর একটি বক্তব্য দিতে। আমি নেহায়েত বোকাসোকা মানুষ বলে সেখানে বক্তব্য দিতে রাজি হয়েছিলাম। বক্তব্য দেয়ার সময় দেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভাইস চ্যান্সেলররা অল্প সময়ের জন্য এসে চেহারা দেখিয়ে চলে গেলেন এবং যাওয়ার আগে বলে গেলেন, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা যথেষ্ট ভালোভাবে চলছে, সেটা পরিবর্তন করার কোনো প্রয়োজন কিংবা সুযোগ নেই! কিছু ভাইস চ্যান্সেলর বললেন, তাদের নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে পরীক্ষা নেয়া হলে তাদের মান নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। আমি ভেবেছিলাম সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হলে শিক্ষকদের যে একটা বাড়তি উপার্জন কমে যাবে সেই কথাটি হয়তো অন্তত ভদ্রতা করে কেউ মুখ ফুটে বলবে না। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর সেটা বলেই ফেললেন! তিনি জানালেন, ভাইস চ্যান্সেলর হয়ে তিনি যদি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতিতে রাজি হয়ে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যান, তাহলে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেবেন না! অর্থলোভের এরকম সহজ-সরল স্বীকারোক্তি আমি এর আগে আর কারও মুখে শুনিনি।

আমি তখনই বুঝেছিলাম, এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কখনোই নিজের উৎসাহে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার জন্য এগিয়ে আসবেন না। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা শুরু করার একটিমাত্র উপায়, সেটি হচ্ছে তাদের জোর করে রাজি করানো! বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত, তাই তাদের জোর করে রাজি করানোর কাজটি সহজ নয়! সেটি করতে হবে অনেক উপরের মহল থেকে চাপ দিয়ে। আমার ধারণাটি ভুল ছিল না, শুধু মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিষয়টি উত্থাপন করার পরই প্রথমবার সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সত্যি কথা বলতে কী, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রথমবার মহামান্য রাষ্ট্রপতির ইচ্ছাটুকুর প্রতি সম্মান পর্যন্ত দেখায়নি। এ বছর প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে, আমি এখনও নিঃশ্বাস বন্ধ করে আছি, যতক্ষণ পর্যন্ত সত্যি সত্যি বিষয়টি না ঘটবে, আমি নিশ্চিত হতে পারব না।

আমার আশঙ্কাটুকু মোটেও অমূলক নয়। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার আলোচনাটি শুরু হওয়ার পর নানা ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষের কিছু কথা আমার কানে আসছে। বক্তব্যগুলো এরকম : ‘সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা কি মুখের কথা? বললেই হল?’ কিংবা ‘এটা কোনোদিন কাজ করবে না! নেভার।’ কিংবা, ‘মেডিকেল নিচ্ছে বলেই আমাদের নিতে হবে কে বলেছে? মেডিকেল আর আমরা কি এক জিনিস?’ ইত্যাদি ইত্যাদি!

আমি আশা ছাড়তে রাজি নই। আমি জানি প্রক্রিয়াটাকে নানাভাবে বাধা দেয়া হবে- অর্থলোভ খুবই ভয়ংকর। একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন খুব কম ছিল- মনে আছে একজন লেকচারারের বেতন কত কম সেটা একবার একটা কলামে লিখে ফেলেছিলাম। পরদিন আমার সহকর্মী লেকচারার মাথায় থাবা দিতে দিতে আমার সঙ্গে দেখা করে বলেছিল, ‘স্যার আপনি করেছেন কী? আমার বিয়ের কথা হচ্ছিল, বিয়েটা ভেঙে গেছে!’ যা হোক, সেগুলো অতীতের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন এখন অনেক বেড়েছে, শুধু টাকার লোভের জন্য এখন এ দেশের ছেলেমেয়েদের প্রতি নিষ্ঠুরতা করে যাবে আমি সেটি বিশ্বাস করি না

আমি আশা করে আছি, এরপরের ভর্তি পরীক্ষাটি হবে একটি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা! বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদের আর কখনও অতীতের নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হবে না।

২.সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে যখনই আলোচনা হয় তখন আমি ‘গুচ্ছপদ্ধতি’ নিয়ে একটা কথা শুনি এবং যখনই এই কথাটি শুনতে পাই তখনই আমি একটা ধাক্কা খাই। আমার মনে হয়, যে ‘গুচ্ছপদ্ধতি’ শব্দটি ব্যবহার করে সে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার বিষয়টি ধরতে পারিনি।

‘গুচ্ছ’ শব্দটির অর্থ একধরনের অনেক বিষয়ের সমাহার। ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার সময় সব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটি গুচ্ছ, সব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটি গুচ্ছ, সব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় মিলে আরেকটি গুচ্ছ- এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বেশ কয়েকটি গুচ্ছে ভাগ করা যেতে পারে। তারপর একেকটা গুচ্ছের জন্য একেকটা ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবে এবং সেটা হচ্ছে গুচ্ছপদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষা। কিন্তু যে বিষয়টা আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না সেটা হচ্ছে, যে ছেলেমেয়েগুলো ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছে তারা কেউ কৃষিবিদ হয়ে যায়নি কিংবা প্রকৌশলী হয়ে যায়নি, কাজেই এখনও তারা নির্দিষ্ট কোনো গুচ্ছের অংশ হয়ে যায়নি! আমরা যদি তাদের একটা পরীক্ষা নিতে চাই তাহলে মোটেও তাদের কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের পরীক্ষা নিই না। কিংবা কৃষিবিষয়ক পরীক্ষা নিই না! তারা সেই বিষয়গুলো এখনও জানে না, এখনও সেগুলো পড়েনি, আমরা তার পরীক্ষা নেব কেমন করে? তারা এইচএসসিতে যে বিষয়গুলো নিয়ে লেখাপড়া করেছে, আমরা শুধু সেই বিষয়গুলোরই পরীক্ষা নিতে পারি! সত্যি কথা বলতে কী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা আসলে একটা মিনি এইচএসসি পরীক্ষা ছাড়া আর কিছু নয়! সত্যিকারের এইচএসসি পরীক্ষার সঙ্গে এর সবচেয়ে বড় পার্থক্য হচ্ছে, এই পরীক্ষার প্রশ্নগুলো করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। এইচএসসি পরীক্ষায় ছেলেমেয়েদের যে বুদ্ধিমত্তাকে যাচাই করা সম্ভব হয় না, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় চেষ্টা করা হয় সেই বুদ্ধিমত্তাকে যাচাই করার!

কাজেই আমি মনে করি, যখন সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবে তখন যেন ছেলেমেয়েদের আগেই গুচ্ছ গুচ্ছ হিসেবে ভাগ করে নেয়ার চেষ্টা করা না হয়। ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবে তার এইচএসসির বিষয়গুলোর ওপর। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের যে গুচ্ছ বিষয়ের নম্বর বিবেচনা করতে চায়, তারা সেই নম্বরগুলো বিবেচনা করতে পারবে।

সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হলে এ দেশের একটা অনেক বড় অভিশাপকে চিরদিনের মতো দূর করে দেয়া সম্ভব হবে। সেই অভিশাপটি হচ্ছে ভর্তি কোচিং। আমি আশা করে আছি, যারা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার দায়িত্ব নেবেন, তারা যেন সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষাটি নেন এইচএসসি পরীক্ষা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। তখন ছেলেমেয়েরা ভর্তি পরীক্ষাটি সবচেয়ে ভালোভাবে দিতে পারবে। সদ্য এইচএসসি পরীক্ষা দেয়ার কারণে বিষয়বস্তুটা তাদের খুব ভালোভাবে মনে থাকবে, ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য তাদের কোনো কোচিং সেন্টারে টাকা ঢালতে হবে না।

যখন আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিতে রাজি হবে না তখন যশোর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, দুটি বিশ্ববিদ্যালয় মিলেই একটা সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হোক। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় রাজি হয়েছিল এবং দুটি বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটি ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছিল। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো সিলেটে এই অতি চমৎকার উদ্যোগটির বিরোধিতা করে আন্দোলন শুরু করে দিল এবং শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটি আর সফল হতে পারল না।

তবে আমরা যেহেতু সেই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার খুঁটিনাটি বিবেচনা করে কাজ শুরু করেছিলাম, তাই অনেক বিষয় আমরা তখনই সমাধান করেছিলাম, যেগুলো জানা থাকলে ভালো।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এরকম :

ক. ছাত্রছাত্রীরা ভর্তির জন্য আবেদন করার সময়েই জানিয়ে দিত তারা যশোর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নাকি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নাকি দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই বিবেচিত হতে চায়। কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আবেদন করছে তার ওপর নির্ভর করে ফি নির্ধারণ করা হতো (আমি আগেই এটা বলছি, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যেন খানিকটা আশ্বস্ত হয় যে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা হলেও তাদের অর্থ উপার্জনের রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে না!)।

খ. প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির নিজস্ব নিয়মকানুন থাকে। পাবলিক পরীক্ষার নম্বর কত শতাংশ নেয়া হবে, কোন বিভাগে ভর্তি করার জন্য কোন কোন বিষয়ের নম্বর বিবেচনা করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। সোজা কথায় বলা যায়, সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা হলেও প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির নিয়মে তাদের স্বকীয়তা বজায় রাখতে পারবে। তারা শুধু সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার নম্বরটি নেবেন, বাকি সব আগের মতোই থাকবে।

গ. রেজিস্ট্রেশন করার সময় পরীক্ষার্থী ছেলেমেয়েরা জানিয়ে দিত তারা কোন সেন্টারে পরীক্ষা দিতে চায়। আমাদের বেলায় উত্তরবঙ্গের ছেলেমেয়েরা যশোর সেন্টারে পরীক্ষা দিতে আগ্রহী ছিল, অন্যেরা সিলেটে। যদি বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার পরিকল্পনা করে, তাহলে সারা দেশে ত্রিশটির থেকেও বেশি সেন্টার থাকবে এবং কোনো সেন্টারেই বাড়াবাড়ি পরীক্ষার্থী থাকবে না, পরীক্ষা নেয়ার কাজটি অনেক সহজ হয়ে যাবে। ছাত্রছাত্রীরাও নিজের বাড়ির কাছে একটি সেন্টারে পরীক্ষা দিতে পারবে। কষ্ট করে দূরে কোথাও যেতে হবে না।

প্রথম যখন ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল তখন বিষয়টা সবাই ভালো করে বুঝতে পারেনি। অনেকেই ধরে নিয়েছিল এটি শুধু একটি মুখের কথা। কিন্তু বিগত বছরগুলোয় তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে অনেক কাজ হয়েছে। একসময় যেটি কল্পনাও করা যেত না এখন সেটি শুধু যে কল্পনা করা যাচ্ছে তা নয়, সেটি বাস্তবায়ন পর্যন্ত করা যাচ্ছে। কাজেই যারা ভবিষ্যতের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্ব নিচ্ছেন, তারা যদি সময়মতো পরিকল্পনা করে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্য নেন, তাহলে শুধু যে চমৎকারভাবে একটা পরীক্ষা নিতে পারবেন তা নয়, পরীক্ষার পর দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি করানো থেকে শুরু করে ভর্তি-পরবর্তী কাজগুলোও করে দিতে পারবেন।

আমি এখন নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করে আছি দেখার জন্য- সত্যি সত্যি আমরা আমাদের ছেলেমেয়ের হাতে তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহারটি তুলে দিতে পারি কিনা!

মুহম্মদ জাফর ইকবাল : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়; লেখক

সূত্র: যুগান্তর

স্মার্ট ক্যারিয়ার গড়তে join করুনঃ Job Study : Build your smart career