/

বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার আজকের সম্পাদকীয়

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিতঃ ১:১৮ অপরাহ্ণ | জানুয়ারি ৩০, ২০১৮

চার বছরের সংসদের চার বৈশিষ্ট্য…মিজানুর রহমান খান

একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত একতরফা সংসদ চার বছর পার করল। এর চারটি প্রধান বৈশিষ্ট্য আমাদের উদ্বিগ্ন করে। প্রথমত, কোরাম সংকট নিয়ে সংসদ চলছে। এটা নিশ্চিত করে যে সাংসদেরা সংসদবহির্ভূত অন্য কাজে বেশি ব্যস্ত। যদিও ওই সময়ে তাঁরা সংসদ চত্বরে বা ঢাকায় থাকেন, কিন্তু সংসদের কাজে সময় দিতে পারেন না। দ্বিতীয়ত, সংসদীয় কার্যপ্রণালির ৬৮ ও ১৪৭ বিধি অনুযায়ী জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে সংসদে প্রস্তাব পাস করতে পারে, কিন্তু এর আওতায় ধন্যবাদ বা প্রশংসাসূচক প্রস্তাব পাসের প্রবণতা। এমনকি এসব ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চার ঘণ্টা গড়িয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্তও রয়েছে। তৃতীয়ত, বিল পাসে কম সময় লাগা। গড়ে ৩০ মিনিটে বিল পাস হয়েছে। চতুর্থত, সরকারের বিল বা কোনো নীতির প্রশ্নে পক্ষে-বিপক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা দেখা যাবে। এ ছাড়া আরও কিছু বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে কারণে-অকারণে সংসদীয় কমিটির বিদেশ সফর এবং মন্ত্রীদের সংসদ অধিবেশনে কম হাজির থাকা।

সুতরাং এই সংসদের কাছে বাকি এক বছরে আর তেমন কিছু আশাব্যঞ্জক চাওয়ার যুক্তিসংগত কারণ থাকতে পারে না। ওই ধারাই চলবে ধরে নেওয়া যায়। অবশ্য আমরা মনোবল হারাতে চাই না। কারণ গণতন্ত্র হলো চর্চার বিষয়। ব্রিটেনের কয়েক শ বছর লেগেছে, আর আমাদের এখনো অর্ধশতাব্দী পূর্ণ হয়নি। কারও মতে, আমরা শৈশবকাল পার করছি। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক ফার্স্ট লেডি রওশন এরশাদ বলেছেন, তাঁরা একটি নবযুগের সূচনা করেছেন। প্রতিবাদ হবে ওয়াকআউটে, তাই বলে সংসদ বর্জন? নৈব নৈব চ।

গত চার বছরে সাংসদেরা সরকারি বিল পাসে নবম সংসদের চেয়ে কম সময় দিয়েছেন। এবার তাঁরা গড়ে ৩০ মিনিট সময় ব্যয় করেছেন। অনেক বিল ১৫ মিনিটেও পাস হয়েছে। ২০০৮ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতেও ৪০ ভাগ বিল এক ঘণ্টার মধ্যে পাস হয়। কিন্তু সেখানকার সংসদীয় কমিটিতে আইন তৈরির প্রক্রিয়া যতটা দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন হয়, সেটা এখানে হয় কি? পঞ্চম সংসদে সংসদীয় কমিটিকে সংসদ থেকে আলাদা করা যেত। কারণ, কমিটিতে বিরোধী দলের একটা সংখ্যাগত প্রাধান্য ছিল। আর বর্তমান সংসদে জাতীয় পার্টির ৮ মহিলা সংসদ নিয়ে ৩৯। সংসদীয় কমিটির সংখ্যাই ৩৯। সুতরাং সংসদ যাঁরা গঠন করেছেন, তাঁরা সংসদীয় কমিটিকে কার্যকর করার চিন্তা করছেন বলে মনে হয় না। তাঁরা হয়তো ভাবেননি, দেশ চালাতে কিছু কাজ তো করাতে হবে। আর সে জন্য মন্ত্রণালয়গুলোকে নজরদারি করতে প্রতি কমিটিতে বিরোধী দলের অন্তত দুজন সাংসদ আনতে চাইলেও প্রায় ৮০ জন সাংসদ লাগার কথা। ৩৯টি কমিটিতে তাই বিরোধী দলের দুজন করেও রাখা যায়নি।

অবশ্য বিরোধী দলের রাখলেই বা কী হতো? কারণ, সরকারের প্রশংসায় সাবেক স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদের দলটি কখনো সরকারি দলকেও লজ্জা দিচ্ছে। সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের স্বল্পতা কোন পর্যায়ের সংকট তৈরি করতে পারে, তার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এই সংসদ। সংসদে শক্তিমান বিরোধী দল না থাকলে সংসদীয় কমিটিগুলোকে কোনোভাবেই তেমন কার্যকর করা যায় না।

সংসদকে আইনের গুণগত মান দিয়ে চেনা উচিত। যেহেতু সংসদীয় কমিটিগুলোই আইন তৈরির চূড়ান্ত কাজটা করছে। তাই খোঁজ নিলাম, এর প্রক্রিয়া কীভাবে চলে। জানলাম, সাকল্যে ১০ জনের টিম থাকলেও দীর্ঘদিন পাঁচটি পদ শূন্য। আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের একটি লেজিসলেটিভ ড্রাফটিং উইং আছে। কিন্তু এর দক্ষতা ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলেছে, এর সপক্ষে আমরা কোনো প্রমাণ পাই না। এই ঘাটতি পূরণে সংসদের লেজিসলেটিভ ড্রাফটিং উইং শেখ হাসিনার প্রথম সরকারে খোলা হয়েছিল। রোববার একটি নতুন তথ্য জেনে সন্দিগ্ধ হলাম। এটি সত্যি হলে বলব, এটা ক্ষমতার পৃথক্করণের নীতি সমর্থন করে না। দক্ষতার ঘাটতি পড়লে সেটা এভাবে পূরণ করা সমীচীন হতে পারে না।

জানলাম, সংসদে যেসব বিল প্রথমে উঠছে, তাতে অনেক ভুলত্রুটি দেখা যায়। মন্ত্রিসভা বিভাগ যত্নশীল হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু তা করতে গিয়ে আইনের খসড়া তদারককারী মন্ত্রিসভা বিভাগের একটি সাব-কমিটিতে সংসদের একজন প্রতিনিধিকেও অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। জানা গেছে, গত বছরই এটা প্রথম চালু করা হয়েছে। আইন শুদ্ধ করার উপলব্ধি ভালো। কিন্তু তা করার উপায় ঠিক নয়। অবশ্য রূঢ় ও অপ্রিয় সত্য হলো, রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গের সঙ্গে সংসদের যে চিরাচরিত দূরত্ব বা বিরোধ, তা যে ঘুচে গিয়েছে, সেটা এই ঘটনাতেও স্পষ্ট হয়ে পড়েছে। সরকার সংসদে বিল পাসের কোনো প্রস্তাব করার আগে সংসদীয় সচিবালয় এ রকম প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারে না। সরকার ও সংসদের স্বাধীন পরিচয় অটুট রাখতে হবে।

এটা লক্ষণীয় যে গত চার বছরে এই সংসদ বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের মতো অল্প কিছু মৌলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করেছে। সুশাসন ও আইনের শাসনসংক্রান্ত বিষয়গুলোর সঙ্গে সরাসরি জড়িত কোনো আইন, যেমন ফৌজদারি কার্যবিধি, দণ্ডবিধির মতো কোনো কিছুতে তারা হাত দেয়নি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা গুমের মতো বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের ওপর কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তারা কোনো বিল আনেনি। সংসদের ফ্লোরে নির্বাহী বিভাগের কোনো দুর্নীতির বিষয়ে ‘প্রাণবন্ত’ কোনো বিতর্ক হয়নি, তবে উন্নয়নের গুণকীর্তনেই সংসদকক্ষ মুখর ছিল।

সংসদের মতো একটি আপাদমস্তক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বৈধতার প্রশ্নে কোনো একটিমাত্র নির্দিষ্ট রূপকল্প হতে পারে না। আইনিভাবে বৈধ হলেও তা রাজনৈতিকভাবে অবৈধ হতে পারে। আবার কোনো সংসদ আইনি ও রাজনৈতিক উভয় অর্থে অবৈধ হতে পারে। সামরিক বা আধা সামরিক শাসনামলের সংসদগুলোর বৈধতার প্রশ্ন তার উদাহরণ। ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদকে আমরা রাবার স্ট্যাম্প বলি। কিন্তু ভোটারযুক্ত নির্বাচনও রাবার স্ট্যাম্প হতে পারে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন হওয়ার পর চলতি সংসদের বৈধতার প্রশ্ন আলোচিত হয়েছে। সাংবিধানিকভাবে দেখলে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। সরকারি দলের এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয় যে যেহেতু একটি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হতে পারে, তাই সরকার গঠনের জন্য যে ১৫১টি আসন দরকার, তার থেকেও বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে পারে, আর তা সাংবিধানিকভাবে শুদ্ধ।

বর্তমান সংসদ সংবিধানের ৬৫ (২) অনুচ্ছেদে বলেছে, যাঁরা ‘প্রত্যক্ষ নির্বাচন বা ডাইরেক্ট ইলেকশনের’ মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন, তাঁরাই সংসদ সদস্য বলে অভিহিত হবেন। ১৫৪ জন প্রত্যক্ষ নির্বাচনে নির্বাচিত হননি। আমরা বলেছিলাম, এ রকম কাগুজে বৈধতা ভূতাপেক্ষভাবেও মীমাংসা করা চলে। তাই বর্তমান সংসদের বৈধতার বিষয়টি আসলে বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়া বা না নেওয়ার সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পর্কিত নয়। এই লেখার শুরুতে গত চার বছরের যে চারটি বৈশিষ্ট্য আমরা চিহ্নিত করলাম, সেটাই আমাদের বিবেচনায় আইনগত, রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক ও মানুষের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আগেও ওই সমস্যা ছিল, নিরঙ্কুশ শাসন তা আরও নিরঙ্কুশ করেছে। এর থেকে বেরোতে চাইলে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই সব থেকে বেশি ভরসা দিতে পারে।

মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷ 

সূত্র: প্রথম আলো

স্মার্ট ক্যারিয়ার গড়তে join করুনঃ Job Study : Build your smart career

 

অন্যের সিদ্ধান্তে পথ চলা আর কত?…সমীরণ চাকমা

চাকমা সম্প্রদায়ে জন্ম নিয়ে জীবনের শুরুতেই দেখেছি অন্যের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তে আমার বাবাকে চলতে। বাবার মুখে শুনেছি তাঁর পূর্ব পুরুষগণও এভাবেই চলেছেন। আমরা চাকমা সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষ কখনো আমরা উপজাতি, কখনো ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, কখনো-বা আদিবাসী— যে যেভাবে পারছে সেভাবেই তাদের সিদ্ধান্ত আমাদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে। রাঙ্গামাটির প্রত্যন্ত একটি গ্রামে জন্ম নিয়ে জীবনের শুরুতেই দেখেছি হেডম্যান কারবারিরা আমাদের দেখভাল করতেন। মাঝে মাঝে দেবতাতুল্য রাজাবাবুদেরও দেখতাম আমাদের খোঁজ-খবর নিতে। আস্তে আস্তে যখন কিছুটা বুঝে উঠা শুরু করলাম তখন অনুধাবন করলাম জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে পড়াশুনার কোনো বিকল্প নেই। সেই সময়ে আমার গ্রামের নিরক্ষর মানুষগুলোর জীবনযাপন দেখে আমার মনে হতো, একটা অর্থহীন সময় পার করা হচ্ছে। আমার বাবাও বোধহয় এ বিষয়ে কিছুটা বুঝতেন। তিনি রাঙ্গামাটি শহরে আমার এক মাসির বাড়িতে রেখে আমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। সময়টা তখন পাকিস্তান আমলের শুরুর দিকে। স্কুলের গণ্ডি পার হতেই কলেজে ভর্তি হবার পালা কিন্তু কোথায় পড়বো! রাঙ্গামাটিতে তো কোনো কলেজ নেই। আমাদের দেবতাতুল্য রাজাবাবুরা আমাদের পড়াশুনার বিষয়টি বিবেচনায় আনতে চাননি। পরে বুঝেছি অশিক্ষিত লোকদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ এ বিবেচনায় রাজাবাবুরা চাইতেন না আমরা শিক্ষিত হই। আমি যখন কলেজে ভর্তির জন্য উন্মুখ তখন শুনেছি রাজপুত্র আর তার স্বজনেরা কেউ কলকাতায় আবার কেউ চট্টগ্রাম বা ঢাকাতে পড়াশুনা করছে। তাই আমাদের জন্য কোনো ব্যবস্থা রাখার প্রয়োজন তারা মনে করেননি। পরে অবশ্য ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের উদ্যোগে রাঙ্গামাটিতে একটি কলেজ তৈরির চেষ্টা করা হলে তত্কালীন রাজা ত্রিদিব রায় আর বাধা হয়ে দাঁড়াননি। কলেজে ভর্তির জন্য উদ্বেগ থাকায় চট্টগ্রাম গিয়ে আমি বিভিন্ন বাড়িতে লজিং থেকে, টিউশনি করে চট্টগ্রামের একটি কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের পাহাড়ি সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে যখন ভাবি মনে হয়, আমাদের শাসক শ্রেণি বিশেষত রাজাবাবুরা আমাদের অন্যের দয়ায় বেঁচে থেকে একটি মেরুদণ্ডহীন জাতিতে পরিণত করেছিলেন। চাকমা রাজারা তো নিজেদের ঐতিহাসিক আড়ম্বর নিয়ে গর্ব করেন। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে তাদের অনেক ভূমিকা রয়েছে বলেও প্রচার করেন। কিন্তু গত কয়েকশ বছর ধরে এমন ঐতিহাসিক ক্ষমতাধর রাজাগণ আমাদের এমনভাবেই গড়ে তুলেছেন যে, আমাদের তারা পশ্চাত্পদ বলে প্রচার করতে পছন্দ করেন। এখনও আমাদের কোটা পদ্ধতিতে, বিশেষ সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি অথবা চাকরিতে যোগদান করতে হয়। ১০০ নম্বরের ভিতরে ৪০ নম্বর পেয়েও বিশেষ কোটায় উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমরা ভর্তি হতে পারি। অন্যদিকে আমার বাঙালি বন্ধুরা আমাদের চেয়ে পড়াশুনায় ভালো হওয়া সত্ত্বেও এবং আমাদের চেয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অনেক বেশি নম্বর পেয়েও তারা সুযোগ পায় না। আমাদের রাজাবাবুরা হয়তো বোঝেন না, বিশেষ কোটায় সুযোগ পেয়ে ভর্তি হওয়ার সময় আমাদের বাঙালি বন্ধুদের তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি আমাদের আহত করে। আর তারা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকাবেই না কেন, ওরা যে আমাদের চেয়ে বেশি নম্বর পেয়েও ভর্তি হতে পারেনি। বিশেষ কোটার মাধ্যমে সুযোগ পেলেও আমাদের আত্মসম্মানের চেতনাবোধ মানসিকভাবে আমাদের অপরাধী করে তুলতো।

গত এক দশক ধরে রাজাবাবুরা আমাদের আদিবাসী হতে বলছেন। এ বিষয়ে আমি কিছুটা পড়াশুনা করে আমাদের ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে নিশ্চিত হয়েছি যে আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নই। তবে রাজাবাবুরা হঠাত্ করে কেন আমাদের আদিবাসী বানাতে চাইছেন? আমাদের জন্য কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ, আমরা আদিবাসী হতে চাই কি না— এই মতামত কি কেউ আমাদের কাছ থেকে নিয়েছেন? রাজাবাবুরা কি গণভোট করে দেখেছেন, সাধারণ চাকমা সম্প্রদায় আদিবাসী হতে চায় কি-না? আদিবাসী না হয়েও আন্তর্জাতিকভাবে প্রদত্ত এ সংক্রান্ত সংজ্ঞার বিশ্লেষণ করে এর মধ্যে ফাঁক-ফোকর বের করে তারা আমাদের আদিবাসী বানাতে চাইছেন। আমরা এই ভ্রান্তভাবে সংজ্ঞায়িত হয়ে নিজেদের আদিবাসী হিসেবে পরিচিতি নিয়ে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা চাই কি-না এ বিষয়ে আমাদের মতামত কি কেউ গ্রহণ করেছেন? এই ধরনের সিদ্ধান্ত যা অন্যদের কাছে আমাদের করুণার পাত্র করে তুলবে যে, আমরা বিশেষ সুবিধা আদায়ের জন্য মিথ্যার ইতিহাস রচনা করেছি। শুনেছি আমাদের আদিবাসী বানানোর জন্য দেশে-বিদেশে রাজাবাবুরা অনেক দৌড়-ঝাঁপ করছেন। কিন্তু আমরা কি পেয়েছি তাদের এই দৌড়-ঝাঁপের মাধ্যমে? আমাদের সন্তানেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাইলে তো রাঙ্গামাটির বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। সরকার রাঙ্গামাটিতে মেডিক্যাল কলেজ আর প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় করতে চাইলে এই রাজাবাবুরা তাতে বাধা দিয়েছেন। আদিবাসী বিষয়ক ভ্রান্ত মিথ্যার আবর্তের কলঙ্ক আমাদের মধ্যে জড়িয়ে না দিয়ে রাজাবাবুরা পারতেন আমাদের উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করতে। উনারাই বলেন, তাদের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। উনারা চাইলেতো প্রতিটি গ্রামে ভালো ভালো স্কুল, কলেজ স্থাপন করতে পারতেন। গ্রাম পর্যায়ে আমাদের সন্তানেরা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারতো। তখন কোটা পদ্ধতির সুযোগ নিয়ে অন্যের করুণার পাত্র হতে হতো না।

চাকমাদের মেধা রয়েছে, সক্ষমতা রয়েছে, যুগে যুগে রাজাবাবুদের চাপিয়ে দেওয়া পশ্চাত্পদ সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও দেশ-বিদেশে নিজ যোগ্যতায় তারা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছে। এদের জন্য শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হলে তারা দেশ ও জাতির জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। তাই যারা গত কয়েক দশক ধরে আমাদের নিয়ে রাজনীতি করছেন, তাদের বলছি, যুগে যুগে আপনাদের কর্মকাণ্ডে চাকমা সম্প্রদায় ছাড়াও অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠী ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের জীবন একটাই। আমরা আত্মসম্মানবোধ নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই। আমরা কারো করুণার পাত্র হতে চাই না। আমাদের সক্ষমতা রয়েছে। আমরা এ সক্ষমতা ব্যবহার করে বাংলাদেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ করতে চাই। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিক্রমায় স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও বেঁচে থাকার যে স্বাদ আমরা পেয়েছি তাকে পুঁজি করে সামনে এগিয়ে যেতে চাই। আমরা কোনো নেতার ব্যক্তিস্বার্থগত সিদ্ধান্ত, যা শুধুমাত্র তাদেরকে এবং তাদের পরিবারকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সুনাম-স্বীকৃতি প্রাপ্তিতে সহায়তা করবে এবং অপরদিকে আমাদেরকে বাংলাদেশের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর কাছে করুণার পাত্র করে তুলবে সেই পরিবেশ আমরা চাই না। অন্যের সিদ্ধান্তের এই পথচলা এখনই বন্ধ হোক, শুরু হোক ব্যক্তি স্বাধীনতার স্বাদযুক্ত অবারিত এই ধরনীর বুকে দৃপ্ত পথচলা।

সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

 

৮ ফেব্রুয়ারি আদালত কী রায় দেবেন?…আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

৮ ফেব্রুয়ারি তারিখটির দিকে দেশের অনেক মানুষ আগ্রহভরে তাকিয়ে আছে। এই দিন বিএনপি নেত্রীর বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির মামলার রায় ঘোষিত হওয়ার কথা। এই মামলায় মা খালেদা জিয়া এবং ছেলে তারেক রহমান দুজনই অভিযুক্ত। দুজনই বিএনপির শীর্ষ নেতা। সেই এক-এগারোর সরকারের আমলে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট নিয়ে দুর্নীতির মামলায় তাঁরা অভিযুক্ত হন। এরপর দীর্ঘকাল ধরে মামলাটি চলেছে। এত দীর্ঘকাল ধরে একটি মামলা ঝুলে থাকার কারণ কী—সে সম্পর্কে দেশবাসীর মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। একটি কারণ সম্ভবত বেগম জিয়ার আইনজীবীদের বারবার আদালতের কাছে সময় চাওয়া এবং বেগম জিয়ার বিভিন্ন তারিখে আদালতে গরহাজির থাকা।

শেষ পর্যন্ত এই মামলার বিচারকাজ শেষ হয়েছে এবং তার রায় ঘোষিত হতে যাচ্ছে, এটা দেশের মানুষের জন্য একটা বড় সুখবর। কারণ খালেদা জিয়া দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেত্রী। তিনি তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং ভবিষ্যতে তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে তিনি যে আবার প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা প্রায় নিশ্চিত। এমন একজন নেত্রীর গায়ে যদি দুর্নীতির গন্ধ লেগে থাকে এবং সেই গন্ধ নিয়ে তিনি ক্ষমতায় বসেন, তা দেশের জন্য ভালো হবে না।

সুতরাং দেশের আদালতের বিচারে তিনি যদি নির্দোষ বিবেচিত হন, তাহলে তিনি ক্ষমতায় থাকুন আর না থাকুন, তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্রেডিবিলিটি সম্পর্কে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবে না। আর তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁকে আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে আদালতের রায় মেনে নিতে হবে। ভারতের দীর্ঘ ১২ বছরের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পর্যন্ত আদালতের রায় মেনে তিহার কারাগারে ঢুকেছিলেন।

৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুর্নীতির মামলায় আদালত কী রায় দেবেন, তা আমাদের জানা নেই। দেশের মানুষ তাই উত্সুক আগ্রহে এই রায়ের জন্য অপেক্ষা করছে। এই রায়দান যদি কোনো কারণে আদালত মুলতবি রাখেন, তাহলে দেশের মানুষের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দেবে। অনেকে তার মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও খুঁজে বের করবে। দেশের আরেকটি সাধারণ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। এই নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে, এটাই সবার প্রত্যাশা। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে খালেদা জিয়ারই তাতে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা। কিন্তু তিনি একটি মামলায় ঝুলে থাকলে তাঁর নেতৃত্বের ক্রেডিবিলিটি নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। দেশের রাজনীতিতে অনিশ্চিত অবস্থা বিরাজ করবে। আদালত দেশে এই অবস্থা সৃষ্টি হতে দেবেন বলে মনে হয় না। সুতরাং আশা করা যায়, ৮ ফেব্রুয়ারি নির্দিষ্ট তারিখেই এই মামলার রায় ঘোষিত হবে।

এই রায় নিয়ে বিএনপি মহলেই উৎকণ্ঠা সবচেয়ে বেশি। তারা প্রচার করছে, বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। অথচ দেখা গেছে বিএনপি নেত্রীর একাধিক আইনজীবী বলছেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের ঠিকানা তাঁরা জানেন না। অর্থাৎ এই অরফানেজের অস্তিত্বই ছিল কি না সন্দেহ। অথচ এই ট্রাস্টের তহবিলে বিদেশ থেকেও প্রচুর অর্থ সাহায্য এসেছে। সেই অর্থ কোন ব্যাংকে, কোন অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে? প্রশ্নটির সদুত্তর নেই।

তথাপি যদি ধরে নেওয়া যায়, বিএনপি নেতাদের প্রচারণাই সত্য, অর্থাৎ তাঁদের নেত্রীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই আদালতে প্রমাণিত হয়নি, তাহলে তাঁরা আগেভাগেই রায়ের বিরুদ্ধে চিৎকার শুরু করেছেন কেন? সরকার বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য এই রায় ম্যানিপুলেট করছে বলে অভিযোগ তুলছেন কেন? এটা কি চোরের মনে পুলিশ পুলিশ ভাব? বিএনপি নেতারা ধরেই নিয়েছেন, এই মামলার রায় তাঁদের বিরুদ্ধে যাবে। তা যদি হয়, তাহলে তাঁরা আদালতের রায় মানতে রাজি নন। এরই মধ্যে তাঁরা ফেসবুকে এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় সারা দেশের বিএনপির নেতাকর্মীদের ৮ ফেব্রুয়ারির আগে ঢাকায় জমায়েত হয়ে গণ-অভ্যুত্থান ঘটানোর ডাক দিয়েছেন। এই অভ্যুত্থান কার বিরুদ্ধে? সরকার, না দেশের আইনের শাসনের বিরুদ্ধে?

খালেদা জিয়া যদি ৮ ফেব্রুয়ারি আদালতের রায়ে দোষী সাব্যস্তও হন, তিনি উচ্চ আদালতে আপিলের নিশ্চয়ই সুযোগ পাবেন এবং জামিনও পাবেন। এই অবস্থায় নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দিতে তাঁর বাধা কোথায়? জেনারেল এরশাদ দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে থাকাকালে নির্বাচনে একসঙ্গে পাঁচ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হয়েছেন। অবশ্য নির্বাচন কমিশন বিএনপি নেত্রীকে আদালতের শাস্তিদানের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অযোগ্য ঘোষণা করলে অন্য কথা; কিন্তু উচ্চ আদালতে চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন তা করবে মনে হয় না।

সবচেয়ে মজার কথা, এই রায়ে যদি বেগম জিয়াকে নির্দোষ বলা হয়, তাহলে বিএনপি বলবে, বিচার সুষ্ঠু হয়েছে, আর দোষী সাব্যস্ত হলে বলবে বিচারের নামে প্রহসন হয়েছে। সরকার নির্বাচনের আগে এই কারচুপি করেছে। এটা তারা নির্বাচন সম্পর্কেও বলে। নির্বাচনে তাদের জয় হলে বলে, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। আর হার হলে বলে, ‘নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। আমাদের জয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।’ কোনো দল যদি জয়-পরাজয়কে সমানভাবে মেনে নিতে না পারে, তাহলে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তাদের অবস্থান অচল।

খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বারা নয়, একটি সেনা প্রভাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁকে অভিযুক্ত করে। সেই সরকার ক্ষমতায় থাকলে বেগম জিয়ার ভাগ্যে কী ঘটত, তা বলা মুশকিল। এটি কোনো রাজনৈতিক মামলা নয়। যেমন রাজনৈতিক মামলা ছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। আইয়ুব-মোনেম সরকারের এই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রমূলক মামলার বিরুদ্ধে জনগণ বিদ্রোহ করেছে, নেতাকে মুক্ত করেছে। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির যে ১৯টি মামলা দেওয়া হয়েছিল, তার প্রতিটি মোকাবেলা করে তিনি হাইকোর্টের রায়ে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছিলেন।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বর্তমানে যে মামলা তা কোনো রাজনৈতিক মামলা নয়। দুর্নীতির মামলা। তাই এই মামলার বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। যেটুকু প্রতিক্রিয়া তা বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বেগম জিয়া সাহসী নেত্রী হলে এই মামলায় লড়বেন, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবেন। অন্যথায় তাঁকে আদালতের রায় ভালোমন্দ যা-ই হোক, মেনে নিতে হবে। রাজনৈতিক বাধার পাঁচিল তুলে তার আড়ালে বাঁচতে চাইলে বাঁচতে পারবেন না। দলকেও বাঁচাতে পারবেন না।

বিএনপি নেতাদের প্রচারণা হলো, আওয়ামী লীগ সরকার তাঁদের নেত্রীকে কারাগারে পাঠাতে চায়। তাহলে আগামী নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বহারা হবে এবং দলটি ভাগ হয়ে যেতে পারে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিশ্চিত পরাজয় থেকে রেহাই পাবে। আমার ধারণা, আওয়ামী লীগ নেতারা বোকার স্বর্গে বাস না করলে এই ধরনের ষড়যন্ত্রে পা দেবেন না। তাঁরা অতীতে দেননি। যদি আওয়ামী লীগ চক্রান্ত করে বেগম জিয়াকে কারাগারে পাঠায় এবং জনসাধারণ তা বুঝতে পারে, তাহলে হিতে বিপরীত হবে। কারাবন্দি বেগম জিয়ার জনসমর্থন বিপুলভাবে বেড়ে যাবে এবং নির্বাচনে বিএনপিকে তা অপ্রত্যাশিত সাহায্য জোগাবে। জেনারেল এরশাদ কারাগারে বসে নির্বাচনে তাঁর দলকে নেতৃত্ব দেননি? নিজে পাঁচটি আসনে জয়ী হননি?

আর বিএনপির ভাগ হওয়ার কথা? বিএনপি এবারও নির্বাচনে না এলে এমনিতেই দলটি ভাগ হয়ে যাবে। বাইরে থেকে কাউকে চেষ্টা করতে হবে না। বিএনপি বর্তমানে সাংগঠনিকভাবে খুবই দুর্বল।

আন্দোলন করার শক্তি তার নেই। একমাত্র নির্বাচনে অংশ নিলে মাঠপর্যায়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ফিরে আসবে। বিএনপিতে ঐক্য দেখা দেবে। অন্যথায় হতাশ নেতাকর্মীদের মধ্যে বিক্ষোভ দেখা দেবে।  দল বিভক্ত হতে পারে। আমার ধারণা, দলকে ঐক্যবদ্ধ ও সংহত রাখার স্বার্থেই বিএনপি এবার নির্বাচনে যোগ দেবে।

বিএনপি নেতারা হুমকি দিচ্ছেন, আদালতের রায়ে বেগম জিয়াকে সাজা দেওয়া হলে তাঁরা দেশে গণ-অভ্যুত্থান ঘটাবেন। এটা আদালতের সঠিক বিচার ও রায়কে প্রভাবিত করার চেষ্টা, যা সমর্থনযোগ্য নয়। এ ধরনের হুমকি জামায়াত নেতারা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারেও দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, গোলাম আযম ও নিজামীদের দণ্ড দেওয়া হলে সারা দেশে আগুন জ্বলবে। সে আগুন জ্বলেনি। কারণ যুদ্ধাপরাধীদের পেছনে জনসমর্থন ও জনসহানুভূতি ছিল না।

আমি জানি না, ৮ ফেব্রুয়ারির রায়ে বেগম জিয়া নির্দোষ, না দোষী সাব্যস্ত হবেন। যদি দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে এই রায়ের বিরুদ্ধেও কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে বিএনপি ব্যর্থ হবে। কারণ এ ব্যাপারে জনসমর্থন ও জনসহানুভূতির অভাব। তবু ৮ ফেব্রুয়ারির আদালতের রায় যা-ই হোক, দেশের রাজনীতিতে একটা পরিবর্তন আসবে। বিএনপির বর্তমান খালেদা-তারেক নেতৃত্ব টিকে থাকবে কি থাকবে না, তা এবার পরীক্ষিত হবে। এমনকি রাজনৈতিক ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে বিএনপির একটি নবরূপান্তরণ ঘটতে পারে।

৮ ফেব্রুয়ারির রায়ের জন্য আমিও তাই অনেকের মতো অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি।

লন্ডন, সোমবার, ২৯ জানুয়ারি ২০১৮

সূত্র: কালের কন্ঠ

 

‘আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ এখন আওয়ামী লীগ’….বদরুদ্দীন উমর

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী নিজেদের দলের ভেতরকার ময়লা বাইরে ফেলার জন্য অনেক কৃতিত্ব ও পরিচিত অর্জন করেছেন।

এদিক দিয়ে তার সর্বশেষ কীর্তি হচ্ছে, ২৬ জানুয়ারি মানিকগঞ্জে দলের সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন উপলক্ষে আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে তার নানা বক্তব্য।

তিনি সেই সভায় আওয়ামী লীগের লোকজনকে সম্বোধন করে বলেন, ‘দেশে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। আপনাদের খারাপ ব্যবহারের কারণে দলের সুনাম ম্লান হয়ে যায় এমন কাজ থেকে বিরত থাকুন।’ জনগণের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে তিনি নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।

এ ছাড়া তিনি নেতাকর্মীদের গ্রামে গিয়ে ঘরে ঘরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘দেখুন কে কোন্ পার্টি করে। তার তালিকা করুন। নিরপেক্ষদেরও তালিকা তৈরি করুন।… ঘরের মধ্যে ঘর বানাবেন না।

দলের নেতাদের সম্পর্কে অপপ্রচার বন্ধ করে উন্নয়নের কথা জনগণকে বলুন। আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হচ্ছে আওয়ামী লীগ। ঘরে ঘরে কলহ। দলের মধ্যে আরেক দল। এসব কলহ, কোন্দল আর সহ্য করা হবে না।’ (যুগান্তর ২৬.০১.২০১৮)

এসব যে খুব মজার মজার কথা এতে সন্দেহ নেই। এতে মজা বেশি এ জন্য যে, এসব কথা খোদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের মুখনিঃসৃত! এসব মজার কথার শানে নজুল হচ্ছে- আওয়ামী লীগের অবস্থা এখন ভালো নেই।

তারা অন্য কথা বাদ দিলেও সাংগঠনিকভাবেও এক গভীর সংকটে এখন হাবুডুবু খাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে যে, আওয়ামী লীগের নানা অপকীর্তির সমালোচনা যে শুধু বিরোধী দলগুলোই করছে তা নয়। তাদের অপকীর্তি এখন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যাতে দলের লোকরাও এখন এসব নিয়ে চুপ নেই। তারাও মুখ খুলেছে। দলের নেতাদের সম্পর্কে অপপ্রচার বন্ধ করার নির্দেশও মন্ত্রী তার দলের লোকদের দিয়েছেন। এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, তাদের নিজেদের লোকরা কোনো কারণ ছাড়াই নেতাদের বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার’ চালাচ্ছেন। তারা যা বলছেন এটা ‘অপপ্রচার’ কখনোই হতে পারে না, যদি দলের নেতানেত্রীরা ধোয়া তুলসী পাতা হয়ে থাকেন। বাইবেলে আছে- Physician heal thyself, অর্থাৎ চিকিৎসক, আগে নিজের চিকিৎসা কর।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক উপস্থিত নেতাকর্মীদের দলের নেতাদের সম্পর্কে ‘অপপ্রচার’ বন্ধ করতে এবং জনগণকে দেশের উন্নয়নের কথা বলতে বলেছেন। এটা ঠিক যে, দেশে এখন কিছু উন্নয়ন হয়েছে।

কিন্তু এই উন্নয়নের অর্থ কী? এর কোনো ফল কি কোটি কোটি জনগণের, গরিব শ্রমজীবী মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে? আসলে তাদের অবস্থা আগে যা ছিল, তার থেকে এখন অনেক খারাপ হয়েছে।

শিক্ষা, চিকিৎসার দুর্দশার কথা বাদ দিলেও, এখন তাদের খাওয়ার পাত থেকে মাছ, গোশত তো দূরের কথা, শাকসবজি পর্যন্ত উঠে গেছে। এ কথা কে না জানে? বিশেষ করে জনগণের থেকে এটা বেশি আর কে জানে? দেশে যত উন্নয়ন হচ্ছে, দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থা ততই খারাপ হচ্ছে।

এখানে ‘উন্নয়নের’ অন্য দিকের কথা বাদ দিয়ে সড়ক ও সেতুর কথা যদি ধরা যায়, তাহলেও বিষয়টি পরিষ্কার হবে। দেশে অনেক সড়ক তৈরি হয়েছে- ঢাকা, চট্টগ্রাম শহরে অনেক উড়াল পুল হয়েছে।

একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সমীক্ষা রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, এই উড়াল পুলগুলোর খরচ বাংলাদেশে হচ্ছে চীনে যা হয়ে থাকে তার চার গুণ, ভারতের তিন গুণ এবং পাকিস্তান ও নেপালের দ্বিগুণ!

এই বাড়তি খরচের টাকা কোথায় যাচ্ছে? এটা কি চরম এবং বেপরোয়া চুরি, দুর্নীতি লুটপাটের কারণে হচ্ছে না? আর এটা ঘটছে খোদ সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রীর মন্ত্রণালয়েই।

শীর্ষ পর্যায়ের নেতা, মন্ত্রী ও আমলারা এই চুরি, দুর্নীতি, লুটপাটের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণেই যে এটা হচ্ছে, এতে সন্দেহ কার আছে? এসব দুর্নীতির টাকা কি জনগণের, এমনকি আওয়ামী লীগের ছোট ও মাঝারি নেতাদের পকেটে পড়ছে?

সেটা যদি হতো, তাহলে এই ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কি উচ্চপর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচারে’ নিযুক্ত হতে পারতেন? আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক যখন নিজেদের দলের নেতাকর্মীদের নেতাদের বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার’ বন্ধ করার নির্দেশ দেন, তখন এসব প্রশ্ন কি অবান্তর?

অন্য প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে দলের নেতাকর্মীদের প্রতি সাধারণ সম্পাদকের একটি নির্দেশ উল্লেখযোগ্য। তিনি তাদের নির্দেশ দিয়েছেন- গ্রামে গ্রামে, ঘরে ঘরে গিয়ে কে কোন্ পার্টি করছে, এমনকি যারা নিরপেক্ষ, তাদেরও তালিকা প্রস্তুত করতে।

এ ধরনের কর্মসূচির কথা বলা শুধু উদ্ভটই নয়, চরম অগণতান্ত্রিক। নিজেদের অপকর্মের পরিবর্তে এভাবে তালিকা প্রস্তুত করার নির্দেশের অর্থ- যারা বিরোধী দল করে, এমনকি যারা নিরপেক্ষ তাদেরও হিসাব করা এবং তাদের বিরুদ্ধে সবরকম দমন-পীড়নের পাঁয়তারা করা।

এই দমন-পীড়ন মানুষের সহ্যসীমার বাইরে ইতিমধ্যে চলে গেছে। কিন্তু নির্বাচন সামনে রেখে আরও বৃদ্ধি করার মতলবেই যে এ তালিকা প্রস্তুত করার প্রয়োজন তাদের হচ্ছে, এ বিষয়ে মূর্খ অথবা মতলববাজ ছাড়া আর কার সন্দেহ থাকতে পারে?

দেশে এখন সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্দশার শেষ নেই। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা পর্যন্ত ভয়াবহভাবে বিপন্ন। খুন, গুম, ধর্ষণ- ছাত্রলীগ-যুবলীগ ইত্যাদির ব্যাপক গুণ্ডামির কারণে শহর ও গ্রামাঞ্চলের মানুষের জীবন ও মান-ইজ্জতের নিরাপত্তা বলতে আজ আর কিছু নেই।

এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীরও এ কথা বলতে অসুবিধা হয় না যে, তাদের শাসনে বাংলাদেশের মানুষ এখন সুখে-শান্তিতে আছে, তাদের জীবনে নিরাপত্তা আছে, যা ক্ষমতায় এলে অন্য কোনো দলের পক্ষে জনগণকে দেয়া সম্ভব নয়! কাজেই আওয়ামী লীগের আবার ক্ষমতায় আসা দরকার। তবে বুঝতে অসুবিধা নেই, নিজেদের জন্য ক্ষমতায় ফিরে আসা তাদের দরকার।

জনগণের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই, এ কথা বলা যে এক হাস্যকর ব্যাপার এতে সন্দেহ নেই।

সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ এখন আওয়ামী লীগ। ঘরে ঘরে কলহ! দলের মধ্যে আরেক দল।’ তাদের এই স্বীকৃতির অর্থ কি এই নয় যে, আওয়ামী লীগ সরকারের অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে, যাতে তাদের বিরুদ্ধে সমালোচনা শুধু বিরোধী

দলগুলোর দ্বারাই হচ্ছে তাই নয়, শীর্ষ নেতাদের চুরি-দুর্নীতি, লুটতরাজের কোনো বখরা বা ফায়দা নিচের স্তরের নেতাকর্মীরা না পাওয়া এবং সেটা শুধু নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার ফলেই আওয়ামী লীগ এখন আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হয়েছে? এর অর্থ কি এই নয় যে, আগামী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে আওয়ামী লীগ সংগঠনের মধ্যে ভালোভাবেই ভাঙন ধরেছে? আর এই ভাঙন বা সংকট সামাল দেয়ার চেষ্টায় মরিয়া হয়েই এখন তারা ঘরের ময়লা বাইরে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন?

এই পরিস্থিতিতে গণতন্ত্র একেবারেই শিকেয় তুলে আওয়ামী লীগ নিজেকে রক্ষার জন্য আরও ব্যাপক আকারে দমন-পীড়নের উদ্দেশ্যে যে নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও সমগ্র প্রশাসনকে ব্যবহারের চেষ্টা করবে এতে সন্দেহ নেই।

বিরোধী দলের সবরকম গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পূর্ণ হরণ করে তাদের বিরুদ্ধে জেলজুলুম ছাড়াও নানা ধরনের মিথ্যা মামলা দায়ের করে নির্বাচনে জয়লাভের চেষ্টায় আওয়ামী লীগ সরকার এখন মরিয়া হয়েছে।

২০১৪ সালে তারা এভাবেই একটি ভুয়া নির্বাচন করে জোরপূর্বক ক্ষমতায় ফিরে এসেছিল। কিন্তু এবার সে চেষ্টার পুনরাবৃত্তি করলে আওয়ামী লীগের জন্য যে তা সুফল বয়ে আনবে, এটা মনে করার কারণ নেই।

২৭.১.২০১৮

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

সূত্র: যুগান্তর

স্মার্ট ক্যারিয়ার গড়তে join করুনঃ Job Study : Build your smart career