/

‘কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেপথ্যের কাহিনী’

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিতঃ ৯:৫০ পূর্বাহ্ণ | মার্চ ১৭, ২০১৮

সরকারি চাকুরীতে কোটা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতি পুরস্কার প্রাপ্ত সাংবাদিক মো. কামাল হোসেন তার ফেসবুক একাউন্ট Md Kamal Hossain-এ ‘কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেপথ্যের কাহিনী’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধ, শহীদ পরিবার, চলমান নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থার অবব্যবস্থাপনার নানারকম জানা-অজানা কিছু তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করে ভিন্ন ধারার যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন। পাঠকদের জন্য স্ট্যাটাসটি লেখা হুবহু তুলে ধরা হলো:

‘কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেপথ্যের কাহিনী’

কোটার বিরুদ্ধে যারা আন্দোলন করছেন তারা আসলে কতটা মেধাবী? আর কোটায় যারা নিয়োগ পাচ্ছে তারা কতটা মেধাহীন?

এমন তো নয় যে অষ্টম শ্রেণি পাস লোকজন কোটা সুবিধা নিয়ে বিসিএস ক্যাডার হয়ে যাচ্ছে, আর এর পাশাপাশি মাস্টার্স পাশ করে কোটা না থাকায় উচ্চ শিক্ষিত লোকজন নিয়োগ বঞ্চিত হচ্ছে। যারা যে কোটায় চাকরি পাচ্ছে, এবং কোটাবিহীন যারা, উভয় সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের অধিকারী হিসাবে আবেদন করে। এটাই বাস্তবতা তাই নয় কি?

উভয়ের মধ্যে হয় তো কেউ ৬০ মার্ক পেয়ে পাস করেছে, আর কেউ একটু কম মার্ক পেয়ে পাস করেছে, এই তো পার্থক্য, কিন্তু উভয় ছাত্র পাস তো করেছে, উভয়ে একই মানের সনদ পেয়েছে, তাই না?

তাহলে মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে, মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে, এমন কোরাস বা প্রচারের উদ্দেশ্য কি?
এই অবস্থায় কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেপথ্যে আসলে কি আছে, তা নিয়ে একটু গভীরে যাওয়া যাক।

২৭তম থেকে ৩০তম বিসিএসের মেধা কোটায় চাকরি পেয়েছে ৬৭ দশমিক ৮ শতাংশ। প্রায় ৭০ শতাংশ চাকরি এখন মেধার ভিত্তিতেই হচ্ছে। মহিলা কোটা পূরণ করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, উপজাতিদের জন্য যে ৫ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত রয়েছে তার মাত্র দশমিক ৬৪ শতাংশ কোটা পূরণ হয়েছে ২৭তম থেকে ৩০তম বিসিএসে। এই অবস্থার মূল কারণ ছিল, মুক্তিযোদ্ধা ও উপজাতি কোটায় লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন সবার কোটা ঠিক রেখে উপজাতিদের জন্য পাশের নম্বর কিছুটা কমিয়ে আনা হয়েছিল। যাতে তারা কোটা পূরণ করতে পারে।

২৭তম থেকে ৩০তম বিসিএসের এই কোটা পূরণ হয়েছে গড়ে ১২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। ১৯৮২ সালে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পূরণ হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, ১৯৮৩ সালে ১৩ শতাংশ, ১৯৮৪ সালে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, ১৯৮৫ সালে ৫ শতাংশ, ১৯৮৬ সালে ১ শতাংশ, ১৯৮৭ সালে ১ শতাংশের সামান্য বেশি, ১৯৮৮ সালে শূন্য শতাংশ, ১৯৮৯ সালে ১ শতাংশের কিছু বেশি এবং ১৯৯০ সালে ১ শতাংশ। অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা থাকলেও সেটা কোটা পূরণ হয়নি কোনো বছরই।

কোটা ব্যবস্থা বাতিল হলে সংবিধানের ২৯(৩) ‘ক’ ধারার বরখেলাপ হবে। কোটা ব্যবস্থা সংশোধন করা দরকার কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলই এতে হাত দেবে না। কারণ বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর।

তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধাগণ তো দেশ প্রেমের পরীক্ষায় পাস করেছেন। সময়মত সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সর্বকালের সেরা মেধাবী তা প্রমাণ করেছেন। আবার কেন এটা নিয়ে বিতর্ক করতে হবে।

যারা একাত্তর সালে সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি, বা মেধার যোগ্যতায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি, তার দায় কেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা নিবে?

বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ কোটার বিরুদ্ধে বলে কিন্তু তারপরও বিশ্বব্যাংকের সর্বোচ্চ পদে আমেরিকান ছাড়া কেউ বসতে পারে না। আইএমএফের শীর্ষ পদেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে কেউ নিয়োগ পায় না।

কোটা ব্যবস্থা চালুর উদ্দেশ্য-কোটা পদ্ধতি কি ?
দেশের সর্বোচ্চ পরীক্ষা বিসিএস এর মাধ্যমে নারী ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী যাতে সমান সুবিধা নিতে পারে এই লক্ষ্যে সরকার বিসিএসে উত্তীর্ণদের (প্রিলিমিনারী, লিখিত ও মৌখিক –তিনটিতেই উত্তীর্ণ) মধ্যে থেকে নারী, উপজাতী বা পশ্চাৎপদ জেলাগুলোর অধিবাসী প্রার্থীদের ‘কোটা পদ্ধতি’র ভিত্তিতে চাকরী প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রাধিকার দেয় ।

বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালে সরকারি, বেসরকারি, আধা- সরকারি, এবং জাতীয়করণকৃত প্রতিষ্ঠানে জেলা ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধা, ক্ষতিগ্রস্থ মহিলাদের জন্য কোটা প্রবর্তন করে আদেশ দেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় এই কোটা প্রথা সংস্কার ও পরিবর্তন করা হয়।

বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১ম ও ২য় শ্রেণির সরকারি নিয়োগে কোটা রয়েছে প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, নাতি নাতনির জন্য ৩০ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা চাকরি বিদ্যমান রয়েছে।

কিন্তু একটা ব্যাপার ভেবে দেখবেন কোটাধারীরা আকাশ উড়ে এসে জুড়ে বসেনি, তারা কিন্তু এই জনপদের পিছিয়ে পড়া মানুষ। তারা অতি মেধাবীরা (বুদ্ধিমানরা) কৌশলে পিছিয়ে থাকতে বাধ্য করেছে এই পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোকে। তাই তো দেখবেন কেউ কেউ গর্ব করে বলে তাদের জেলার ৩৩ সচিব একসাথে ছিল এক সময়।

আর এই জন্য কোটা করতে হয়েছে যেন, সাম্যের ভিত্তিতে সব জেলায় মেধাবী তৈরি হতে পারে। নারীসহ সব পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী এগিয়ে যেতে পারে। বেশি সচিব দেশের সাধারণ মানুষের ট্র্যাক্সের টাকায় সুযোগ নিয়ে সারা দেশে সমানভাবে মেধাবী মানুষ তৈরি করতে পারেননি। এটাই হলো বাস্তবতা।

কোটাধারীরা কিভাবে পিছিয়ে পড়েছে তাহলে শুনুন, মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা পক্ষে ছিল, তাদের বাড়ি-ঘর লুটপাট করা হয়েছে, পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, উপার্জনকারী ব্যক্তিদের হত্যা করা হয়েছে, এমতাবস্থায় উক্ত পরিবারগুলো স্বাধীন দেশ পেলেও সহায় সম্পদের দিক থেকে নিঃস্ব, অসহায় মানুষে পরিনত হয়। ফলে তাদের সন্তানরা স্বাভাবিকভাবে শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে যায়।

অন্যদিকে যারা বিপক্ষে ছিল তাদের বেশিরভাগ ছিল লুটপাটের সাথে যুক্ত, আর যারা লুট-পাট করেনি, আর যাই হোক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যারা ছিল, তাদের মত বা তাদের পরিবারের মতো ক্ষতির শিকার হতে হয়নি। ফলে তাদের সন্তানরা অনুকূল পরিবেশে শিক্ষিত হয়ে পরবর্তীতে অধিকতর শিক্ষিত হয়েছে।

আবার যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিল তারা ছিলেন অত্যন্ত আবেগপ্রবন মানুষ, তারা স্বাধীনতার পরে অস্ত্র জমা দিয়ে যার যার বাড়িতে ফিরে গেলেন, আর ভাবলেন তাদের দায়িত্ব শেষ। তাদের এই সহজ-সরল ভাবনার সুযোগে বিরোধীরা দেশের সকল ভাল ভাল আয়-রোজগারের জায়গাগুলো দখল করে নিয়েছে।

এমনকি আগের দিন পর্যন্ত যে সরকারী কর্মচারী পাকিস্তানের সেবা করেছে, সে পরদিন থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের কর্মচারী বনে গেলেন, আর তার সাথে যুক্ত হলো রাতারাতি ধনী বনে যাওয়া গোষ্ঠী, যাদের বেশির ভাগই স্বাধীনতার সময় দীর্ঘ নয় মাস লুটপাটে ব্যস্ত ছিল। তাদের হাতে সম্পদ ছিল, সেই সম্পদ দ্বারা সব কিছু কিনে নিতে শুরু করে।

যদি কোটা না থাকতো তা হলে হয় তো স্বাধীনতার এতো বছর পর বিশেষ কয়েকটি জেলার লোক ছাড়া দেশের বেশির ভাগ এলাকার মানুষ সরকারি চাকুরী কি, তার স্বাদ পেত না, কারণ ঐ টাকার জোর। আর মেধা তো চলমান ভঙ্গুর বা অসম্পূর্ণ ও মুখস্ত বিদ্যা শিক্ষায় সনদধারী, আর সনদই এই দেশের চাকুরী পাবার একমাত্র মাপকাটি নয়। এর বাহিরে আরেক হল লেনদেন, যারা করে তারা এটা অন্যায় মনে করে না, বরং এটাকে তাদের অতিরিক্ত যোগ্যতা মনে করে। যদিও ব্যতিক্রমও আছে, তবে তা বিরল।

এদিকে সরকারি নতুন আদেশে দেখা যাচ্ছে, জনসংখ্যা অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে নিয়োগে ঢাকা জেলার জন্য সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং বান্দরবান জেলার জন্য সবচেয়ে কম শূন্য দশমিক ২৭ শতাংশ কোটা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সাধারণত সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত, আধা-স্বায়ত্বশাসিত, বিভিন্ন করপোরেশন ও দপ্তরে সরাসরি নিয়োগে জেলার জনসংখ্যার ভিত্তিতে জেলাওয়ারি কোটা পুনঃনির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ ২০০৯ সালের ২০ ডিসেম্বর জেলাওয়ারি কোটা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

এছাড়া প্রশাসনিক আদেশে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পূরণ না হলে সেক্ষেত্রে পদ শূন্য রাখা হয় বলে প্রচার করা হয়, কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে মেধা বা অন্যান্য কোটায় অগ্রগামীদের মধ্যে থেকে মুক্তিযোদ্ধা কোটার শূন্য পদ পূরণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু এটা প্রচার করা হয় না, হয় তো বিশেষ কোন উদ্দেশ্যে।

বাংলাদেশে এই কোটা নিয়ে অপপ্রচারের সুযোগটা তৈরি হয়েছে স্বাধীনতার পর থেকে, স্বাধীনতাপূর্ব সরকারি কর্মচারীরা স্বাধীনতার পর রাতারাতি বাংলদেশের কর্মচারী বনে যাওয়ার মাধ্যমে বহুমুখী যড়যন্ত্রের মাধ্যমে। এই ধরুন, কোটা হয়েছে স্বাধীনতাপন্থী রাজনৈতিক নের্তৃবর্গের সিদ্ধান্তে আর তা বাস্তবায়নে ছিল স্বাধীনতাপূর্ব সরকারি কর্মচারীরা, তাদের বিরাট একটি অংশ মন থেকে স্বাধীনতাই মানতে পারেনি, আর তো কোটা। তাই সব কিছুতে যেন বির্তক তৈরি হয়, সে ব্যবস্থা করেছে। নয় তো দেখুন, বিসিএস সহ সকল চাকুরীর পরীক্ষা সাধারণ কোটার সঙ্গে একসাথে হবে কেন?

কোটা ভিত্তিক পদগুলোকে আলাদা পরীক্ষার মাধ্যমে কেন পূরণ করার ব্যবস্থা নেওয়া হলো না। হয় তো তারা জানতো যে কেউ ৫০ মার্ক পেয়ে নিয়োগ না পেলে তার মনে কষ্ট তৈরি হবে যে, কোটায় ৪৫ পেয়েই পরিচিত কেউ একজন চাকুরী পেয়ে গেছে। এবং এই ব্যাপারে অসন্তোষ তৈরি হবে, একদিন তার বিস্ফোরণও ঘটবে, হয়েছেও তাই।

বাংলাদেশের এক নম্বর সমস্যা হল দূর্নীতি। সর্বাবস্থায় এই দুর্নীতি সোনার বাংলা বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে আসছে, এই দূর্নীতির বিরুদ্ধে কেউ যথাযথ প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি। তা দিন কে দিন বাড়তে বাড়তে এখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের খ্যাতিও নিয়ে আসছে।

এব্যাপারে টিআইবি’র ২০০৭ সালের রিপোর্টের নীরিখে আসুন, আমরা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজবার চেষ্টা করি । রিপোর্টের নবম পৃষ্ঠায় ‘Irregularities in BCS examination’ শিরোনামে কঠিন ভাষায় যেসব কথা লেখা আছে তা নিয়েই আলোচনা শুরু করা যাক ।

১. ঘুষের লেনদেন ও চুক্তিভিত্তিক ‘মেধা’ নির্বাচন নিয়ন্ত্রন করা যাচ্ছে না বলে ক্রমেই বর্ধিষ্ণুতার হার বাড়ছে । উদাহরনস্বরূপ জরিপে দেখানো হয়েছেঃ

ক। মেরিট লিস্টে থাকা প্রার্থীদের পছন্দসই ক্যাডার প্রদানে যেসব চুক্তি করা হয় তার অর্থের পরিমাণঃ
• প্রশাসন / পুলিশ ক্যাডার – ৳ ৫-৭ লাখ
• কাস্টমস্ / ট্যাক্স – ৳ ৮-১০ লাখ
• প্রফেশনাল ক্যাডার – ৳ ২-৩ লাখ

খ। মেরিট লিস্টে না থাকা প্রার্থীদের পছন্দসই ক্যাডার প্রদানে যেসব চুক্তি করা হয় তার অর্থের পরিমাণঃ
• প্রশাসন / পুলিশ ক্যাডার – ৳ ৮-১০ লাখ
• কাস্টমস্ / ট্যাক্স – ৳ ১০-১২ লাখ
• প্রফেশনাল ক্যাডার – ৳ ৩-৫ লাখ।

এই দর কিন্তু অনেক গুন বেড়েছে। এমনকি এই রিপোর্ট ভূয়া হিসাবে কেউ মামলা করেনি। কারণ অভিযোগ সত্য, আর এই বাস্তবতায় যদি বলা হয় দেশে কোন চাকুরী নাই, আছে শুধু কিছু সরকারি পদ যা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ক্রয় বিক্রয় হয়। এখন বাস্তবতায় তা কি কম বলা হবে?

স্মার্ট ক্যারিয়ার গড়তে join করুনঃ Job Study : Build your smart career

আর একটা কথা, কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন যারা করছেন, তাদের হয় তো কিছু অভিযোগ আছে, আর তা হল যতটা বঞ্চনার তার চেয়ে ইর্ষার, দেশে কতো কতো সমস্যা, সেগুলোর বিরুদ্ধে কথা না বলে কোটার বিরুদ্ধে বলছেন যেন কোটা তুলে দিলে একবারে সব পেয়ে যাবেন।

৩৮তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তিতে দুই হাজার ২৪টি পদে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়। ৩৮ তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন করেন তিন লাখ ৮৯ হাজার ৪৬৮ জন। এর মধ্যে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় ১৬ হাজার ২৮৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। ৩৭৩১৮২ জন বাদ পড়েছেন শুরুতে।

৩৮ বিসিএস পরীক্ষায় প্রায় তিন লাখ ৮৯ হাজার ৪৬৮ পরীক্ষার্থী ছিল, তার মধ্যে চাকুরী হবে মাত্র দুই হাজারের মতো। বাকি যে তিন লক্ষ তেয়াত্তর হাজার ১৮২ উচ্চ শিক্ষার্থী চাকুরী পাবে না তাদের দোষ কোথায়?

যদি বলা হয় ফেল করেছে, তাহলে তো শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা উচ্চ শিক্ষার সনদ প্রাপ্ত হওয়ার পরও ফেল!
তাহলে কি দাঁড়ালো কোটা আন্দোলন হলো ‘উদর পিন্ডি বুদুর উপর চাপানো’ নয় কি?

সমস্যা শিক্ষা ব্যবস্থার, সমস্যা রাষ্ট্রের, কোটার নয়। আর মাথা যন্ত্রণার জন্য মাথা কেটে ফেলা কোনো সুষ্ঠু সমাধানও নয়। রাষ্ট্র কেন গণহারে এতো বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দিলো আর চাকুরীর ব্যবস্থা কেন করতে পারছে না।

তা নিয়ে আন্দোলন হবে হয় না, আন্দোলন হয় ঐ দুই হাজারের মধ্যে হয় অর্ধেক কোটায় চাকুরী হবে এই ইর্ষায়। কোটাধারীরা কি উড়ে আসা কোন অন্য গ্রহের মানুষ?

তারা তো এই দেশের মানুষ, হয় তো কারো কারো হিংসা হয় তাদের (কোটাধারীদের) পূর্বপুরুষ কেন মুক্তিযুদ্ধ করেছিল, তাদের (হিংসাকারীর) কাছে কৃতজ্ঞতা আশা করা নবাব সিরাজুদৌলার মতো মীরজাফরের কাছ থেকে সততার সাথে দায়িত্ব পালন প্রত্যাশা করার মতো হবে। তাদের কাছে তো মুক্তিযুদ্ধ-ই কোন বড় ব্যাপার না।

তাই তো স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও শহিদ ও তাদের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরি হয়নি। স্বাভাবিকভাবে ক্ষতিপূরণও পায়নি, হয় তো কিছু লোক পেয়েছে, তাদের মধ্যে আবার বিতর্কিতরাই বেশি।

এমনকি আন্দোলন হয় না, কেন শুধু চাকুরী নিতে পরীক্ষা দিতে, আবার বারবার পরীক্ষা দিতে হবে। এমন কি পিয়নের চাকুরীসহ সকল চাকুরীতে নিদিষ্ট শিক্ষা সনদ লাগবে, অন্য দিকে দেশের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী যারা তাদের রাজনীতি করার জন্য ও পদ গ্রহণের জন্য কেন মেধা সনদ ও পরীক্ষা লাগে না?

আবার আন্দোলনকারী মেধাবীর মনে কষ্ট লাগে না, তার ভোট একটি, আর যে একটি অক্ষর লেখতে পারে না, তার ভোট যে সমান! দুজনের বিবেচনাবোধ কি সমান?

আবার ভবিষ্যতে যাদের অধীনে চাকুরী করবেন, যেমন জেলা, উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য প্রভৃতির অধীনে, তো তাদের কি মেধা দরকার নাই?

তারা তো বস হবে, তখন তো তাদের হুকুমে কাজ করতে হবে, তখন কি বর্তমান মেধাবীদের মেধার অবমূল্যায়ন হবে না, তখন কষ্ট লাগবে না?

শুধু কষ্ট লাগে কোটা দেখলে?

দুঃখ লাগে এদেশে ধণী-গরীবের বৈষম্য নিয়ে আন্দোলন হয় না, রাস্তার ঘুমানো গৃহহীন মানুষের জন্য মেধাবীরা আন্দোলন করে না, নাকি তারা রাতের ঢাকায় বাহির হয় না?

নাকি শুধুই থ্রি-কোয়াটার প্যান্ট পড়ে খালি মুখস্ত বিদ্যা অর্জনে ব্যস্ত?

আন্দোলন হয় না, রাস্তায় জ্যামে পড়ে কোটি কোটি ঘন্টা রাস্তায় অপচয় হয়, তার জন্য বা তার প্রতিরোধের জন্য। অথচ আলাদা করে রাজধানীর মতো সকল সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কয়েকটি শহর বানালে গৃহহীনও থাকবে না আবার জ্যামও থাকবে না, আর যদি দুইশিফট সরকারী অফিস ব্যবস্থা করলে তো শিক্ষিত লোকদের এই চাকুরী সমস্যাই থাকে না।

আরো আন্দোলন হয় না, যত্রতত্র অপরকল্পিত শিল্পনগরী গড়ে তোলার, অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলার, এতে শ্রমিকের হয় তো চাকুরী হয়, কিন্তু স্থানীয় ও বাড়িওয়ালা নামের দানবের হাতে সাধারণ ক্ষুধার্ত নিরীহ মানষকে নির্যাতনের লাইসেন্স দেওয়া হয়, তার জন্য। অথচ সেই অর্থনৈতিক জোনে একটি প্রকল্পে সকল শ্রমিক কর্মচারীর বাসস্থানের ব্যবস্থা করলে, স্থানীয় ও বাড়িওয়ালা নামের দানবের হাতে শত শত ধর্ষণের রেকর্ড হবে না, আর একজন লোক সারাদিন কাজ করে ভাড়া বাবদ অর্ধেক টাকা দিয়েও অনিরাপদ থাকবে না। অন্যদিকে দেশে ভূমিহীন বলেও কেউ থাকবে না।

কিছু মানুষ আছে, যারা ভাল মানুষের মুখোশ পড়ে ইনিয়ে, বিনিয়ে কথার বলার মাঝে, আসলে পুরনো এর্লাজির (৭১ এর পরাজয়ের প্রতিশোধ) সুযোগ হাত ছাড়া করতে দ্বিধাবোধ করে না। প্রকৃত স্বাধীনতা চেতনার পক্ষের কেউ আর যাই হোক মুক্তিযোদ্ধার সুযোগ সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে না।

আর মেধার কথা বলছেন, উচ্চ শিক্ষায় পাশ করা একজন মানুষ কি মেধাবি নয়? হয়তো কেউ ৬০ পেয়ে পাশ করেছে আর কেউ ৪৫, ৫০ পেয়ে পাশ করেছে তাই না? বেশি মার্ক তুলতে পারলে যদি বেশি মেধাবি হয়, তাহলে তো দেশের সকল স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়ে শুধুমাত্র কোচিং সেন্টারে পড়ানো উচিত। কারণ সেখানকার শিক্ষার্থীরা স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চাইতে বেশি মার্ক তুলতে পারে!

আর একটা ব্যাপার হল বিশ্ববিদ্যালয় পড়া অবস্থায় দেখেছি যে, যারা রাজনৈতিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক ও মানবিক কাজে জড়িত তাদের চাইতে, যারা দুনিয়ার কোন মানবিক কাজে জড়িত না হয়ে, কোনো জাতীয় সমস্যার খবর না রেখে শুধু পড়াশুনা করত, তারাই বেশি মার্ক তোলে, তাহলে কি শুধুই মুখস্ত বিদ্যাই মেধা যাছাইয়ের একমাত্র পথ হতে পারে? অন্যের উপকার করা ও মানবিকতা মেধা নয় কি?

বাস্তবতা হল শুধু মেধায় গরীব এই দেশে চাকুরী পাওয়া যায় না। এমনকি প্রাইভেট কোম্পানীগুলোতে এখন একই অবস্থা, বিশেষ কারো আত্মীয় না হলেই ফেল! এই হলো গরীব দেশের মেধা যাছাই!!

আজকে যাদেরকে সম্পদশালী দেখছেন ও সেই টাকায় তাদের সন্তানরা পড়াশুনা করে শিক্ষিত হয়ে, নিজেদের মেধাবী দাবী করছে তার একটি বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধের সময় হয় লুট করা টাকায়, না হয় মুক্তিযোদ্ধার ত্যাগের কারণে স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশের অনুকূল পরিবেশের সুযোগ সুবিধা নিয়ে পেয়েছে।

অথচ স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও কোনো তালিকা হয়নি ত্রিশ লাখ শহীদের, তাদের উপার্জনে সক্ষম স্বামী-সন্তানসহ সর্বহারা পবিবারের খোঁজ কতটা কে নিয়েছে? তারা কি ক্ষতিপূরণ পেতে পারে না?

আজ কোটার বিরোধীতা করেছেন, কিন্তু মেধার বাহিরেও আরো যে অনৈতিক লেনদেন ছাড়া চাকুরি হচ্ছে না, সেগুলো নিয়ে কেউ কথা বলছে না। তবে ঘুষনির্ভর মেধার মূল্য কি?
তাহলে খারাপ কাজও মেধা হিসাবে বিবেচিত হবে?

তাহলে তো বিবেকহীনতাও মেধা?
এমন মেধা তো কালোবাজারী, সন্ত্রাসী, লুটেরা মার্কা খলনায়ক শ্রেণির তো আছে এমনকি বাংলা ছবির খলনায়কেরও আছে!
আন্দোলন শুধু উল্টে-পাল্টে দে বাবা, লুটে-পুটে খাই। এর জন্য?

সারা দেশের সকল মানুষের কল্যাণ হয় এমন ভাবনা ছাড়া বাকিটা মেধা হয় কি করে?

একটি ব্যাপার মনে রাখবেন এখনো বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরোধীতা করার লোকের অভাব নাই, আবার সুযোগ পেলে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কাজ করতে দেরি করে না এমন মানুষ কিন্তু কম না এদেশে।

সেই সাথে কিছু মানুষ আছে, যারা ভাল মানুষের মুখোশ পড়ে ইনিয়ে, বিনিয়ে কথার বলার মাঝে, আসলে পুরনো এর্লাজি (৭১ এর পরাজয়ের প্রতিশোধ) চুলকানোর সুযোগ হাত ছাড়া করতে দ্বিধাবোধ করে না। প্রকৃত স্বাধীনতা চেতনার পক্ষের কেউ আর যাই হোক মুক্তিযোদ্ধার সুযোগ সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে না। হয় তো না বুঝে কিছু লোক জড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু মাষ্টারমাইন্ড আসলে কি চায়?

লেখক: মো. কামাল হোসেন, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতি পুরস্কার প্রাপ্ত সাংবাদিক
kamalhossainjnu@gmail.com

সূত্র: আমাদের সময়.কম