/

এমপিওভুক্তির তালিকায় ১০০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিতঃ ১০:০০ পূর্বাহ্ণ | জুন ২১, ২০১৮

সরকারের শেষ বছরে শিক্ষকদের মুখে হাসি ফুটছে। নির্বাচনের আগেই বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার এমপিওভুক্তি (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) করতে যাচ্ছে সরকার। এতে করে ৬ বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে জট খুলছে নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে আরো ১ হাজার বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা এমপিওভুক্তি করবে সরকার। প্রতি সংসদীয় আসনে ৩টি করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হবে। এর বাইরে বিশেষ ও অগ্রাধিকার ক্যাটাগরিতে আরো ১শ’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি হবে। ইতিমধ্যে এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।

এদিকে বুধবার বিকেলে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য একটি বাছাই কমিটি এবং অনলাইনে আবেদন গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য আরেকটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই দুটি কমিটি গঠন করে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বেসরকারি মাধ্যমিক) জাবেদ আহমেদের নেতৃত্বে গঠন করা হয়েছে ৯ সদস্যের ‘প্রতিষ্ঠান বাছাই কমিটি’। কমিটির সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) মহাপরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (বেসরকারি মাধ্যমিক), যুগ্ম সচিব (আইন), মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (মাধ্যমিক), পরিচালক (কলেজ), মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপসচিব (কলেজ), জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব (বাজেট) এবং সদস্য সচিব হিসেবে থাকবেন যুগ্ম সচিব (বেসরকারি মাধ্যমিক-৩)। এই কমিটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮ অনুযায়ী নতুন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করবে। প্রতিষ্ঠানের আবেদনের তথ্যে কোনো অনিয়ম বা অসামঞ্জস্য থাকলে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেও সরকারের কাছে সুপারিশ করবে। প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয়েও এই কমিটি সুপারিশ করবে।

অন্যদিকে অনলাইনে আবেদন গ্রহণের জন্য (ব্যানবেইস) মহাপরিচালক মো. ফসিউল্লাহর নেতৃত্বে গঠন করা হয়েছে ৮ সদস্যের কারিগরি কমিটি। এই কমিটিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়, অধিদফতরের জ্যেষ্ঠ সিস্টেম অ্যানালিস্ট, প্রোগ্রামারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে।

এই কমিটি নীতিমালা অনুযায়ী শর্ত পূরণ করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রস্তুত করার জন্য অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করবে। আবেদনগুলোর ডেটা প্রসেসিং কার্যক্রমও তদারক করবে এই কমিটি। সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রস্তুত করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরে গ্রেডেশন তালিকা ‘প্রতিষ্ঠান বাছাই কমিটির’ কাছে উপস্থাপন করবে এই কমিটি।

এদিকে এমপিও ঘোষণা দিতে সময় বেঁধে দিয়েছেন আন্দোলনরত নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশন। ২৩ জুনের মধ্যে এমপিওভুক্তির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না হলে নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা অনশনসহ কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। দাবি আদায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন নন-এমপিও শিক্ষকরা।

অন্যদিকে নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য এমপিও নীতিমালা ২০১৮ ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই নীতিমালার আলোকে স্কুল ও কলেজ এমপিওভুক্ত করা হবে। এমপিও নীতিমালায়, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরিতে নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ও অবসরের বয়স নির্দিষ্ট করা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির শর্তে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব, শিক্ষার্থী সংখ্যা, পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মেধাক্রম/মনোনয়ন/নির্বাচন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইনডেক্স নম্বর বা নিবন্ধন সনদ ছাড়া কাউকে নিয়োগ দেয়া যাবে না। নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষা জীবনে শুধু একটি তৃতীয় বিভাগ/সমমান গ্রহণযোগ্য হবে।

এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, বাজেটে আলাদাভাবে উল্লেখ না থাকলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি করতে এটা কোনো বাধা হবে না। বাজেটে থোক বরাদ্দ রয়েছে। এমপিওভুক্তির ব্যাপারে সরকার কাজ করছে। একই ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সোমবার সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আগামী অর্থবছরে ১ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হবে।

বছরজুড়ে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবি নিয়ে রাজপথে ছিলেন শিক্ষকরা। এ ছাড়া বেতনের ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট ও বৈশাখী ভাতা নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ সত্ত্বেও অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে খাত উল্লেখ না করলেও নন-এমপিও ও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র দাবি করেছে।

জানা গেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জন্য ১৫ হাজার কোটি রাখা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বরাদ্দ থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বার্ষিক ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টে দিতে ৪শ’ কোটি টাকা, বৈশাখী ভাতার জন্য ১৮৬ কোটি টাকা এবং নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি করতে ৫শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হবে। সরকার রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে প্রস্তাবিত বাজেটে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনী বছরে শিক্ষকদের জন্য উপহার হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন। তাই প্রস্তাবিত বাজেটে এ ৩টি খাতের কথা অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেননি। এমপিরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার তাগিদ দিচ্ছেন। এ নিয়ে কয়েক দফা শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জাতীয় সংসদে এমপিদের তোপের মুখেও পড়েছেন।

এমপিরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার তালিকা দেয়ার পরও তা না হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। সারাদেশে এমপিদের চাপ এবং আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে নির্বাচনী আসন গুরুত্ব দেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরে জাতীয় সংসদের আসন অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি করা হবে। সে ক্ষেত্রে সংসদীয় আসন প্রতি ৩টি করে মোট ৯শ’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হতে পারে বলে জানা গেছে। এর বাইরে বিশেষ ও অগ্রাধিকার ক্যাটাগরিতে ১শ’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি হবে।

দেশে এখন এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে একরকম বিনা বেতনে চাকরি করছেন কয়েক লাখ শিক্ষক-কর্মচারী। বর্তমানে দেশে ২৭ হাজার এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক রয়েছেন ৩ লাখ ৫৭ হাজার ২৮৮ জন এবং কর্মচারী রয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৩৭৫ জন। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্কুল ১৬ হাজার ১১৮টি, কলেজ ২৩৭০টি এবং মাদরাসা রয়েছে ৭ হাজার ৫৯৭টি। অভিযোগ আছে, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ৩ হাজারের বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অপ্রয়োজনীয়। শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই কম। পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলও অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। তার পরও এমপিওভুক্ত হওয়ার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের পেছনে প্রতি মাসে সরকারের কোটি কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে।

অন্যদিকে এমপিওভুক্ত হওয়ার জন্য যেসব শর্ত পূরণ করা উচিত তার সব থাকা সত্ত্বেও ৭ হাজার স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা এমপিওভুক্ত হতে পারেনি। রাজনৈতিক বিবেচনা, স্থানীয় এমপির সুপারিশ ছাড়াও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী সংখ্যা, অবস্থানগত দিক, পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল বিবেচনায় আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমপিওভুক্তির সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় অনেক পুরনো প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘদিন এমপিওবঞ্চিত থাকছে। দলীয় প্রভাব কিংবা অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে নামমাত্র সাইন বোর্ডধারী প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে। বহু পুরনো ও যোগ্য প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ছে। এতে এমপিও খাতে কোটি কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালে সর্বশেষ ১ হাজার ৬২৪টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছিল। ২০১১ সালে ১০০০ স্কুল-মাদরাসা এমপিওভুক্তি করার ঘোষণা দেয়া হলেও তা করা হয়নি। নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি বন্ধ রয়েছে ২০১১ সাল থেকে। এতে নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ভীষণ কষ্টে দিন কাটছে। এমপিওভুক্তির দাবিতে অন্তত ২৫ বার আন্দোলন হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে আশ্বাসও মিলেছে। কিন্তু এমপিওভুক্ত করা হয়নি। সূত্র: বিডি জার্নাল