/

তুরস্কে সেনা অভ্যুত্থানের ইতিহাস

জব স্টাডি নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিতঃ ৩:২২ পূর্বাহ্ণ | জুলাই ১৭, ২০১৬

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর যে গণতান্ত্রিক তুরস্কের যাত্রা শুরু হয়েছিল, গত ৫০ বছরে সেখানে বেশ কয়েকটি সেনা অভ্যুত্থান ঘটেছে।

এর মধ্যে তিন বার অভ্যুত্থানে সরাসরি ক্ষমতা দখল করে তুরস্কের সেনাবাহিনী, আর ১৯৯৭ সালে ‘প্রস্তাবনা’ দিয়ে ক্ষমতার রদবদল ঘটায় বলে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

শুক্রবার রাতে দেশটিতে সর্বশেষ একটি অভ্যুত্থানচেষ্টা চালায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা, যদিও তা ব্যর্থ হয়েছে বলে খবর এসেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে।

আঙ্কারার একটি আদালতে তিন দশক আগে সেনাঅভ্যুত্থানের দায়ে বিচার চলছে সাবেক প্রেসিডেন্ট কেনান এভ্রেনের। নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত এবং সেনাশাসনামলে হত্যা-গুম ও নির্যাতনের দায়ে তার এ বিচার চলছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

কামাল আতাতুর্কের ‘দর্শনে অনুপ্রাণিত’ সেনাবাহিনীর দাবি, তারা ‘তুর্কি গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা’। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কামাল পাশার হাত ধরেই অটোমান সাম্রাজ্য থেকে গণতান্ত্রিক তুরস্কের যাত্রা শুরু হয়।

প্রথম অভ্যুত্থান ১৯৬০ সালে

ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে বিরোধীদের চরম উত্তেজনার মধ্যে ১৯৬০ সালে তুরস্কে  প্রথম সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে।

ওই সময় তুরস্কের ক্ষমতাসীন দল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রধানমন্ত্রী আদনান মেনদেরস ও প্রেসিডেন্ট সেলাল বায়ার আতাতুর্ক যুগের বেশ কিছু নিয়মনীতি বদলে ধর্মীয় নিয়মনীতির প্রচলন করেন।

এর মধ্যে ছিল হাজারেরও উপর মসজিদ খুলে দেওয়া, তুর্কি ভাষার বদলে আরবিতে আজান ও নতুন নতুন মাদ্রাসা চালুর অনুমতি। ওই সরকার তরুণদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক চাকরির সময়ও কমিয়ে আনার ঘোষণা দেয়।

এগুলোর পাশাপাশি সরকারের দমন-পীড়নমূলক আইন ও সমালোচনাধর্মী পত্রিকা বন্ধের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন শুরু করে বিরোধীরা।

এ অবস্থায় ১৯৬০ সালের শুরুর দিকে জরুরি অবস্থা জারি করে ক্ষমতাসীন সরকার। এরপরই তুরস্কের ইতিহাসে প্রথমবারের মত দৃশ্যপটে আসে সেনাবাহিনী।

ওই বছরের ২৭ মে অভ্যুত্থান ঘটায় তারা। তাৎক্ষণিকভাবে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও বেশ কয়েকজন মন্ত্রীকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’সহ বেশ কয়েকটি অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।

তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল সেমাল গুরসেল ক্ষমতা কুক্ষিগত করে সেনা-নিয়ন্ত্রিত নতুন রাজনীতির সূচনা করেন, অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী আদনান মেনদেরসকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

প্রথম এ অভ্যুত্থানের ব্যাপ্তিকাল ছিল ১৯৬৫ পর্যন্ত।

অর্থনীতির ধসের ধাক্কায় দ্বিতীয় অভ্যুত্থান

পুরো ৬০-র দশকে অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়ে তুরস্কে রাজনৈতিক অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করে। ওই সময় শ্রমিক সংগঠনগুলো বেশ কয়েকটি বড় বড় প্রতিবাদ কর্মসূচি সংঘটিত করে; এসব ক্ষোভ-বিক্ষোভ মাঝে মাঝেই সহিংস আকার ধারণ করতো।

পাশাপাশি ডানপন্থি দলগুলোও নানা ধরনের সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল। কমছিল মুদ্রার মান, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছিল বছর বছর ৮০ শতাংশ হারে।

এ অবস্থায় এক দশকের মধ্যেই দ্বিতীয় অভ্যুত্থান হয় তুরস্কে।

‘শৃঙ্খলা ফেরাতে’ ১৯৭১ এর মার্চে দেশটির চিফ অব জেনারেল স্টাফ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সুলিমান ডেমিরেলকে দেশ পরিচালনায় কামাল আতাতুর্কের দর্শন মেনে নতুন একটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য সরকার গড়তে ‘স্মারকলিপি’ দেন।

কয়েক ঘণ্টা পর মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন ডেমিরেল।

রক্তপাতহীন ওই অভ্যুত্থানে পর ‘সরাসরি’ ক্ষমতায় বসেনি সামরিক বাহিনী। তারা প্রথমে মধ্য বামপন্থি রিপাবলিকান পিপলস পার্টির নেতা নিহাত এরিমকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান নিযুক্ত করে। দুই বছর পর দেশটির সংসদ অবসরপ্রাপ্ত নৌ কর্মকর্তা ফাহরি কোরুতার্ক-কে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়।

এ দফায় ক্ষমতাচ্যুত ডেমিরেল এরপরও রাজনীতি চালিয়ে যান এবং দুই দশক পরেই আবার তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী হন। ডেমিরেল ১৯৯৩ থেকে ২০০০ পর্যন্ত দেশটির প্রেসিডেন্টও ছিলেন।

তৃতীয় অভ্যুত্থানে ‘স্থিতিশীলতা’

দ্বিতীয় দফা অভ্যুত্থানের পরের আট বছরে ১১জন প্রধানমন্ত্রী বদল করে তুরস্কের পার্লামেন্ট। অর্থনীতির ক্রমঅধোগতি আর বাম-ডান দলগুলোর মুখোমুখি সংঘর্ষে তুরস্কের রাস্তাগুলো তখন পরিণত হয়েছিল রক্তের সমুদ্রে। ওই দশকেই হাজারেরও উপর নাগরিক গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছিলেন।

১৯৭৯-র শেষ দিক থেকে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের গুঞ্জন ওঠে। পরের বছর মার্চে কয়েকজন জেনারেল অভ্যুত্থানের প্রক্রিয়া শুরু করে। বেশ কয়েকবার বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর সেপ্টেম্বরে তাদের চেষ্টা সফল হয়।

এ দফায় সেনাবাহিনী প্রধান এভ্রেনকে প্রেসিডেন্ট ও নৌবাহিনীর কর্মকর্তা বুলেন্ট উলুসুকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বিলুপ্ত করা হয় পার্লামেন্ট, জারি হয় জরুরি অবস্থা।

দুই বছর পরই উলুসুর জায়গায় নতুন প্রধানমন্ত্রী হন তারগুত ওজাল, যাকে তুরস্কের অস্থির অর্থনীতিকে সুস্থির করার কৃতিত্ব দেন বিশ্লেষকরা।

ওজাল রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অনেক শিল্প-কারখানা ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেন। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের হার কমে আসে।

তবে অভ্যুত্থানকালীন সময়ে কয়েকহাজার ব্যক্তিকে আটকের অভিযোগ রয়েছে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে; এদের মধ্যে অনেকেই ‘চিরদিনের জন্য নিখোঁজ হয়ে যান’, ডজনের উপর ব্যক্তিতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়, বাকিদের উপর চলে নির্যাতন।

১৯৮২ সালে নতুন সংবিধান প্রণয়নে গণভোটের ডাক দিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাতে সাড়া দেয়, সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যায়।

অর্থনৈতিক মন্দা আর অস্থির রাজনীতির কারণে দুই দশকজুড়ে নির্বাচিত সরকারগুলো যে ‘অভ্যুত্থানের চোখরাঙানির’ মধ্যে ছিল, ৮২-র পর তা অনেকখানিই কমে আসে।

১৯৯৭ সালে ‘উত্তরাধুনিক ক্যু’

তুরস্কের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর ‘হস্তক্ষেপের’ সর্বশেষ ঘটনা ঘটে ১৯৯৭ সালে।

দুই বছর আগে ক্ষমতা নেওয়া ইসলামপন্থি ওয়েলফেয়ার পার্টি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার রাষ্ট্রে ‘মৌলবাদী নীতি’ প্রয়োগের চেষ্টা করছে এমন অভিযোগ এনে সেনাবাহিনী সরকারকে কয়েকটি প্রস্তাব দেয়।

এর মধ্যে ছিল মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করে সবার জন্য বাধ্যতামূলক আট বছরের শিক্ষা কার্যক্রম চালু এবং ইউনিভার্সিটিতে হেডস্কার্ফ নিষিদ্ধ করা।

ইসলামপন্থি সরকার সেগুলো মেনে নিতে বাধ্য হয়। পরে সেনাবাহিনীর চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেকমেতিন এরবাকান। পরের বছর তুরস্কে ওয়েলফেয়ার পার্টির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়, এরবাকানকে দেওয়া হয় পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা।

সরাসরি অভ্যুত্থান না করেও সরকার বদলের এ ঘটনাকে বিশ্লেষকরা ‘উত্তরাধুনিক ক্যু’ হিসেবে অভিহিত করেন বলে জানিয়েছে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা।

নিষিদ্ধঘোষিত ওই ওয়েলফেয়ার পার্টির অনেক সদস্য পরে জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট (এ কে) পার্টিতে যোগ দেন, যাদের মধ্যে বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়িপ এরদোয়ানও একজন।

২০১০ সালে ডানপন্থি এরদোয়ান সরকারের বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভের সময় অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন এক দল সৈন্য অভ্যুত্থানের একটি চেষ্টা চালিয়েছিল বলে গণমাধ্যমে খবর আসে।

ওই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ৩০০ সেনা সদস্যকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুই বছর বাদে দেশটির সাংবিধানিক আদালতের রায়ে তাদের অধিকাংশই মুক্ত হয়।